প্রফেসর· এ ম. এ. হালিম
ছোট বেলায় যখন আমি আমার মৌলভী পিতা ততকালীন আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রথিতযশা অধ্যাপক-এর হাত ধরে বাইরে বের হতাশ পথিপাশ্বস্থ লোকজন তখন আমার পিতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সমীহ করে সালাম দিতেনঃ ‘আসসালামু আলায়কুম’। ‘আসসালামু আলায়কুম’ শব্দের পুরোপুরি অর্থ না বুঝলেও এটা যে একটা সম্মানসূচক অভিবাদন তা অনুধাবন করতে আমার সে বয়সেও আমার কষ্ট হয়নি। সপ্তম শ্রেণীতে উঠে ‘আসসালামু আলায়কুম’ পুরো শব্দটা না পেলেও আরবি ‘সালামুন’ শব্দটি পেয়েছিলাম-এর অর্থ হচ্ছে শান্তি, প্রশান্তি এবং এ শব্দ থেকেই যে ‘আসসালামু আলায়কুম’ বাক্যটি এসেছে তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। কালক্রমে, কি করে এ বাক্যটি নিজের অজান্তে স্বতঃস্ফূতভাবে রপ্ত হয়ে গিয়েছিল তা আজ আর স্মরণে নেই।
‘সালাম’ সম্বন্ধে আমার যে বার্যকালীন ইমেজ গড়ে উঠেছিল তা এই যে বয়স্ক যে কোন লোকই সালাম পাওয়ার যোগ্য। বয়স্ক লোকদের সম্বন্ধে আমার পূর্বেকার ধারণা ছিল যে, তাঁরা সমাজে নমস্য ব্যক্তি এবং তাঁরা মানবীয় সব দোষ ত্রুটির উর্ধ্বে। বয়স্ক লোকদের শ্বেত-শুভ্র শ্মশ্রু আজানুলম্বিত সফেদ পাঞ্জাবী এবং মেজাজের ভাবগম্ভীরতা আমার এ ধারণাকে আরো সুদৃঢ় করে তুলে। তাই যত্রতত্র তাঁদের দেখলেই আমি আমার স্বভাব-সুলভ এবং পারিবারিক শিক্ষাজাত ‘সালাম’ ঠুকে দিতাম। সালামের গূঢ় তাতপর্য অবশ্য আমি জেনেছি অনেক পরে।
‘আসসালামু আলায়কুম’ বাক্যের তরজমা হলঃ আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক। এ হচ্ছে সালামের সহজ-সরল সাদামাটা অর্থ। সালামদানকারী ও গ্রহণকারী উভয়েই উভয়ের মঙ্গল, কল্যাণ ও শান্তি কামনা করে এরূপে বাক্য বিনিময় করে থাকেন-এর পেছনে কোন উদ্দেশ্য, কোন স্বার্থ বিজড়িত নেই। নেহাত শান্তি কামনা করেই পারস্পারিক সুখ ও সমৃদ্ধি অর্থে আমরা এরূপ ভাব বিনিময় করে থাকি। ভাব বিনিময়ের সম্পর্কে নির্দেশিত আছে যে, যে ব্যক্তি ‘সালাম’ বা অভিবাদন দান করে তার প্রতিদান বা প্রতি জবাবে তাকে আরো কিছু অতিরিক্ত প্রদান করা উত্তম, যদি, তা না পারা যায় তবে ন্যূনপক্ষে এর অনুরূপ। অর্থাত কেউ যদি বলেনঃ ‘আসসালামু আলায়কুম’ তবে প্রত্যুত্তরে ‘ওয়া আলায়কু ওয়া সালাম ওয়া রাহমাতুলস্নাহে’ বলা উত্তম, না পারলে ন্যূনপক্ষে ‘ওয়া আলায়কুম ওয়া সালাম’। তবে এর চেয়ে অতিরিক্ত বিনিময় বাড়াবাড়ি রূপেই গণ্য হয়, কারণ, এতে সালাম প্রদানের ভাব বিনিময় কেবলই দীর্ঘায়িত বা প্রলম্বিত হয়।
============================================
অভিবাদন হিসেবে ‘সালাম’-এর পরিমিতিরোধ সত্য অবাক করার মতো। পারস্পারিক শান্তি, রহমত ও কল্যাণ কামনায় ‘সালাম’ সামাজিক আচরণের এক উদার সুন্দর ও মহত এবং উতকৃষ্টমানের শিষ্টাচার। এর মধ্যে কোন কলুষতা, গর্ববোধ বা আত্মম্ভরিতা নেই-আছে শুধু অনাবিল ও অমলিন শান্তি কামনা।
============================================
বর্নিত আছে যে, এক ব্যক্তি অধিক কল্যাণ লাভের প্রত্যাশায় রাসূল (সঃ)-কে অভিবাদনে বললেন, ‘আস সালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুলস্নাহ ওয়া বারাকাতহু’। রাসূল (সঃ) নীরব থাকেন। বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বলেনঃ কল্যাণের সবটুকু তুমি নিজেই নিঃশেষ করে ফেলেছে-আমার জন্য অবশিষ্ট্য কিছু রাখনি। অভিবাদন হিসেবে ‘সালাম’-এর পরিমিতিরোধ সত্য অবাক করার মতো। পারস্পারিক শান্তি, রহমত ও কল্যাণ কামনায় ‘সালাম’ সামাজিক আচরণের এক উদার সুন্দর ও মহত এবং উতকৃষ্টমানের শিষ্টাচার। এর মধ্যে কোন কলুষতা, গর্ববোধ বা আত্মম্ভরিতা নেই-আছে শুধু অনাবিল ও অমলিন শান্তি কামনা।
‘সালাম’ প্রদানের একটা প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক দিক রয়েছে। অজ্ঞাত ও অপরিচিতজনের নিকট সালাম এক ভূমিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। অফিস-আদালত, কল-কারখানায় অপরিচিত ব্যক্তির নিকট প্রথমেই সরাসরি মনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পরিব্যক্ত করা যায় না-আবার নির্বোধ বোকার মত দাঁড়িয়েও থাকা যায় না। এ ক্ষেত্রে ‘সালাম প্রারম্ভিক আলোচনার সূচনা করে আমাদেরকে একটা বিব্রত ও অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে রক্ষা করে। ‘সালাম’ এমন একটি শব্দ যা শত্রুর উপর প্রয়োগ করলেও তার রাগ বা দ্বেষ থাকেতে পারে না। মনে হয় দুই অপরিচিত ব্যক্তির মধ্যে সংযোগ সাধনের জন্যেই এর সৃষ্টি। পারস্পরিক সংযোগ সাধনে ‘সালাম’-এর চেয়ে অন্যকোন উন্নত ও উতকৃষ্টমানের শব্দ আছে বলে আমার জানা নেই।
মনোযোগী ও অতিশয় কর্মব্যস্ত মানুষের কোন প্রকার বিরক্তি উতপাদন না করে ‘সালাম’ অতি-সহজেই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। যে ব্যক্তি অতি ব্যস্ত এবং অবনত মস্তকে তার কাজ ধীরে-সুস্থে করে যাচ্ছে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সালামের জুড়ি নেই। কাশি, আকস্মিক শব্দ, বা স্যার স্যার শব্দ উচ্চারণে কর্মব্যস্ত মানুষের শুধু বিরক্তিই উতপাদন করে না, সময় সময় এসব আচরণ বেয়াদবীর পর্যায়ও পড়ে। স্যার স্যার শব্দ উচ্চারণ করলে বুঝা যায় যে তার অধীনস্থ কোন লোক তার নিকট আসছে এবং কতৃত্বের মানসিকতা তাকে পেয়ে বসে এবং ভাবে যে খানিক পর লক্ষ্য করলেই চলবে। কিন্তু, সালাম প্রদান করলে এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। সালাম প্রদানকারী নিজ অধীনস্থ না হয়ে বাইরেরও কেউ হতে পারেন। অধিকন্তু, সালাম প্রদানকারী আপনার নিকট অন্য কোন কিছু না হউক সালামে উত্তর প্রত্যাশা করে। সালাম পেয়ে এর বিনিময় প্রদান না করা অশালীন এবং স্বাভাবিক আচরণবিধির লংঘন। তাই সামাজিক ও ভদ্রতা রক্ষার স্বার্থে সালাম গ্রহীতা তার অবনত মস্তক উত্তোলন করে আপনার পরিচিতি জানতে চায় এবং অতি সহজ-স্বাভাবিকভাবেই সে তা গ্রহণ করে।
============================================
সালামের পুরো বাক্যটি হলঃ ‘আসসালামু ওয়া আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ′ অর্থাত মহান আল্লাহর অনুগ্রহ তোমার উপরে বর্ষিত হোক। পারস্পারিক ভাব আদান-প্রদানের এ শিষ্টাচার মুসলমানদেরকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্য-মন্ডিত করে রেখেছে।
============================================
সালাম আল্লাহর একত্ব বা তৌহিদবাদের বহিঃপ্রকাশ। এক বিশিষ্ট ভঙ্গিতে হাত স্কন্ধের উপরিভাগ পর্যন্ত উঁচু করে শিরে স্বাভাবিক রেখে সালাম আদান-প্রদান করা হয়। অবশ্য শুধু মুখে ‘সালাম’ উচ্চারণেও সালাম দান কার্য সমাধা হতে পারে। একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত শির নত করার বিধান ইসলামে নেই। একমাত্র সালাম এবং সালামেই এ বিধি যথার্থভাবে পালন করা হয়। সালামের পুরো বাক্যটি হলঃ ‘আসসালামু ওয়া আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ′ অর্থাত মহান আল্লাহর অনুগ্রহ তোমার উপরে বর্ষিত হোক। পারস্পারিক ভাব আদান-প্রদানের এ শিষ্টাচার মুসলমানদেরকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্য-মন্ডিত করে রেখেছে।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন অর্থে ‘সালাম’ শব্দের ব্যবহার ও প্রয়োগ নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা করা যেতে পারে। শান্তি ও প্রশান্তির অর্থে সর্বপ্রথম যে আয়াতে ‘সালাম’ শব্দে আর্বিভাব ঘটে তা হচ্ছে সূরা কদরের ৫নং আয়াতে ৯৭:৫। পরিব্যক্ত হয়েছে ‘প্রভাত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ‘সালামুন’ অর্থাত প্রশান্তি বিরাজ করে’। অভিবাদন হিসেবে ‘সালামের’ উল্লেখ পাওয়া যায় সূরা ৫৬:৯০-৯১ আয়াতেঃ “আর যদি ডানদিকের একজন হয়, তবে তাকে বলা হবে, হে দক্ষিন পাশ্ববর্তী! তেমার প্রতি শান্তি”।
সম্ভাষণ হিসেবে বেহেশতবাসীদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছেঃ ‘এই দিন জান্নাতীরা আনন্দে মশগুল থাকবেঃ· করুনাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে ‘সালাম’! ৩৬:৫৫-৫৮
প্রতিদান হিসেবে মুত্তাকীদের জানানো হবে অভিবাদন, তাদেরকে তাদের সবরের প্রতিদানে জান্নাতে কক্ষ দেয়া হবে এবং তাদেরকে তথায় দোয়া ও সালাম সহকারে অভ্যর্থনা করা হবে’। ২৫:৭৫ আয়াতে হযরত ইবরাহীন (আঃ)-এর মেহমানগণ (ফেরেশতাগণ) তাঁকে অভ্যর্থনা হিসেবে ‘সালাম’ বাণী উচ্চারণ করেন এবং হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর পক্ষ থেকে এর জবাবও ছিল ‘সালাম’। “যখন তারা তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন ‘সালাম’ তখন তিনি বললেন, ‘সালাম’ ১১:৬৯, ৫১:২৫। হাদীস বাণী হিসেবে ‘সালাম’ শব্দ পুনঃপুনঃ প্রয়োগ করা হয়েছে প্রত্যেক নবীর নাম উলেস্নখের সাথে সাথে ৩৭:৭৯, ১০৯, ১২০, ১৩০ এবং ১৮১ আয়াতে। ইসলাম প্রচারের প্রারম্ভকাল থেকেই সম্ভাষণের মাধ্যমে হিসেবে ‘সালাম’ রীতি প্রচলিত হয়। “আর যখন তারা আপনার কাছে আসবে আমার নিদর্শনসমূহ বিশ্বাস করে, তখন আপানি বলুনঃ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিক হোক (সালামু আলায়কুম)-৬:৫৪। নিজ গৃহে ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি না নিয়ে এবং অভিবাদন না করে গৃহে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যে পর্যন্ত আলাপ পরিচয় না কর এবং গৃহবাসীদের সালাম না কর —২৪:২৭। “–অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ কর, তখন তোমরা স্বজনদের প্রতি ‘সালাম’ বলবে–২৪:৬১।
============================================
নিজ গৃহে ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি না নিয়ে এবং অভিবাদন না করে গৃহে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যে পর্যন্ত আলাপ পরিচয় না কর এবং গৃহবাসীদের সালাম না কর —২৪:২৭। “–অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ কর, তখন তোমরা স্বজনদের প্রতি ‘সালাম’ বলবে–২৪:৬১।
============================================
অভিবাদনের জবাবে অতিরিক্ত কিছু সম্ভাষণ যোগ করে অভিবাদন দেয়া শ্রেয় ও উত্তম অথবা ন্যূনপক্ষে এর সমপরিমাণ। “তোমাদের যখন অভিবাদন করা হয়, তখন তোমরাও এর অপেক্ষা প্রত্যাভিবাদন করবে অথবা এরই অনুরূপ, আলস্নাহ সর