মানুষ স্বভাবগত ভাবেই রহস্য প্রিয়। রহস্য প্রিয় মানুষেরা রহস্যের খোঁজে বের হয়ে যুগে যুগে পৃথিবীর জন্য অনেক কিছু করেছেন, তাই রহস্যপ্রিয়তাকে মানুষের স্বভাবগত দূর্বলতা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। কিন্তু এই রহস্যপ্রিয়তাকে পুঁজি করে পৃথিবীতে অনেক ধরনের বানিজ্য হয়েছে। বারমুডাও কি সেরকম একটি পণ্য? সেটাই খোঁজার চেষ্টা করবো…
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল যা শয়তানের ত্রিভূজ নামেও পরিচিত এলাকাটি আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিশেষ ত্রিভূজাকার অঞ্চল, যেখান বেশ কিছু জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হওয়ায় কথা বলা হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভৌগলিক অবস্থান নির্দিষ্ট নয়। কেউ মনে করেন এর আকার ট্রাপিজয়েডের মত, যা ছড়িয়ে আছে স্ট্রেইটস অব ফ্লোরিডা, বাহামা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপূঞ্জ এবং ইশোর (Azores) পূর্বদিকের আটলান্টিক অঞ্চল জুড়ে, আবার কেউ কেউ এগুলোর সাথে মেক্সিকোর উপসাগরকেও যুক্ত করেন। তবে লিখিত বর্ণনায় যে সকল অঞ্চলের ছবি ফুটে ওঠে তাতে বুঝা যায় ফ্লোরিডার আটলান্টিক উপকূল, সান হোয়ান (San Juan), পর্তু রিকো, মধ্য আটলান্টিকে বারমুডার দ্বীপপূঞ্জ এবং বাহামা ও ফ্লোরিডা স্ট্রেইটস এর দক্ষিণ সীমানা জুড়ে এটি বিস্তৃত। বিভিন্ন লেখক লেখায় বারমুডার যে বিচিত্র-চিত্র পাওয়া যায় তা নিন্মরুপ-
ছবি সূত্র: উইকিপিডিয়া
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের বিষয়ে বিভিন্ন লেখক লিখতে গিয়ে সর্বপ্রথম ক্রিস্টোফার কলম্বাসের কথা উল্লেখ করেছেন। কলম্বাস লিখেছিলেন যে তাঁর জাহাজের নবিকেরা এ অঞ্চলের দিগন্তে আলোর নাচানাচি, আকাশে ধোঁয়া দেখেছেন। এছাড়া তিনি এখানে কম্পাসের উল্টাপাল্টা দিক নির্দেশনার কথাও বর্ণনা করেছেন।
১৯৫০ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর সর্বপ্রথম এ বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে খবরের কাগজে লিখেন ই. ভি. ডব্লিউ. জোন্স( E.V.W. Jones)। এর দুই বছর পরেই এই বিষয়ে ফেইট (Fate)ম্যাগাজিনে জর্জ এক্স. স্যান্ড( George X. Sand) “Sea Mystery At Our Back Door” শিরোনামে একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেন। এ প্রবন্ধে তিনি ফ্লাইট নাইনটিন ( ইউ এস নেভী-র পাঁচটি ‘টি বি এম অ্যাভেন্জার’ বিমানের একটি দল, যা প্রশিক্ষণ মিশনে গিয়ে নিখোঁজ হয়) এর নিরুদ্দেশের কাহিনী বর্ণনা করেন এবং তিনিই প্রথম এই অপরিচিত ত্রিভূজাকার অঞ্চলের কথা সবার সামনে তুলে ধরেন।
সূত্র: George X. Sand (October 1952). “Sea Mystery At Our Back Door” ও উইকিপিডিয়া
ফ্লাইট নাইনটিনের দূর্ঘটনাকে আমেরিকান লিজান (American Legion) ম্যগাজিনে ১৯৬২ সালে সর্বপ্রথম অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয় (লেখক- Allen W. Eckert (April 1962). “The Lost Patrol”. American Legion.)। সেসময়ে এই রহস্যময় ঘটনা নিয়ে প্রচুর আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯৬৪ সালে ‘The Deadly Bermuda Triangle’ নামের আরেকটি কাহিনী ছাপিয়ে এই আলোড়নে আরো মশলা ঢালার কাজ করেন ভিনসেন্ট গডিস (Vincent Gaddis) নামের এক লেখক। এর উপরেই আরো রং চড়িয়ে ‘Invisible Horizons’ নামের বিখ্যাত বইটি লেখা হয় যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে আরো রহস্যাবৃত করে তোলে। বারমুডার বিষয়ে লেখালেখি পাঠক প্রিয়তার তুঙ্গে উঠে আসলে প্রকাশিত হয় আরো কিছু লেখকের বই। এর ভেতরে উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে ওয়ালেস স্পেন্সারের “লিম্বো অফ দ্যা লস্ট” (Limbo of the Lost, 1969, repr. 1973), রিচার্ড উইনারের “দ্যা ডেভিল’স ট্রায়াঙ্গেল” “শয়তানের ত্রিভূজ” (The Devil’s Triangle, 1974) এবং চার্লস বার্লিটজ (Charles Berlitz)-এর সেই বিখ্যাত বই “দি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল”(The Bermuda Triangle, 1974)। এদের প্রায় সকলেই ঘুরেফিরে একার্ট (Eckert) বর্ণিত অতিপ্রাকৃতিক ঘটানাই বিভিন্ন স্বাদে উপস্থাপন করেছেন। (Allen W. Eckert (April 1962). “The Lost Patrol”. American Legion)।
এসব লেখকরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বিষয়ে কি লিখেছে সেটা কমবেশী সবাই জানেন। সেগুলো বর্ননা করে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। আমরা বরং এই ঘটনাগুলোর পেছনের ঘটনা ও এসব কাহিনীর বিষয়ে হওয়া বিভিন্ন গবেষণা নিয়ে আলোচনা করবো। (more…)



