প্রাইভেট ভার্সিটির 'বড়লোক' পোলাপানদের আবার কিসের আন্দোলন?

গত কয়েকদিন ধরে প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরোধীদের পর্যবেক্ষন করে কয়েকটা শ্রেণী খুঁজে পেলাম। এদের ভেতরে উল্লেখযোগ্য তিনটা শ্রেণীর লোকের কথা দিয়ে শুরু করি-

  • প্রথম দলটা হচ্ছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের উচ্ছিস্টভোগী ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করা কিছু ফেসবুক একটিভিস্ট। এরা যেকোন মূল্যে তাদের দলের পক্ষ নিতে প্রস্তুত। হোক সেটা অন্যায়।
  • দ্বিতীয় দলটা হচ্ছে প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করার ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত কিছু ব্যক্তি যারা মনে করে আন্দোলন করার ক্ষমতা ও অধিকার শুধু পাবলিক ভার্সিটির শিক্ষার্থীদেরই আছে। মানুষ তার জ্ঞানের অভাবটা অহংকার দিয়ে পূর্ন করে থাকে। বড় বড় ভার্সিটি থেকে এরা জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়ে অহংকার দিয়ে নিজেদের পূর্ন করে ফেলেছে। এটাই হচ্ছে সমস্যা।
  • তৃতীয় যে দলটা পেলাম, এদের উপরের দু'টো বৈশিষ্টের কোনটাই নাই, তবুও এরা ছাত্রদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে ইনিয়ে বিনিয়ে নানারকম কথা বলে যাচ্ছে। এদের মূল সমস্যাটা হচ্ছে অজ্ঞতা। সেই অজ্ঞতা এদের ভেতরে যে হীনমন্যতার জন্ম দিয়েছে সেটা তাদেরকে প্রাইভের ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রাইভেট ভার্সিটি নিয়ে এদের প্রধান দু'টো অজ্ঞতা হচ্ছে- ১) প্রাইভেট ভার্সিটিগুলো যে নন-প্রফিট ও ট্রাস্টিবোর্ডের মাধ্যমে চলে তা এরা জানে না। ২) এদের ধারণা, প্রাইভেট ভার্সিটিতে সব 'বড়লোকের' পোলাপান পড়ে। বড়লোকদের প্রতি এদের মনে সীমাহীন বিদ্বেষ, তাই প্রাইভেট ভার্সিটির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে এরা আরাম পায়।
প্রথম দু'টো দল নিয়ে কিছু বলা অর্থহীন। তাই শুধুমাত্র তৃতীয় ঐ শ্রেণীর সমস্যাটা নিয়ে একটু বিস্তারিত বলি। এরজন্য 'বড়লোক' নিয়ে একটু গবেষণার দরকার।
বাংলা ভাষার বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর শব্দ আছে। 'বড়লোক' তার ভেতরে একটা। কোন এক আজব কারণে এইদেশে বিত্তশালীদের 'বড়লোক' বলা হয়। তাহলে যাদের বিত্ত নাই তারা কি ছোটলোক?
তা কিন্তু না। তাহলে বিত্ত থাকলেই বড়লোক হয় কিভাবে? আমার জানা বড়লোকের সংজ্ঞায় মেপে অনেক রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা ব্যক্তিকেও বড়লোক হিসেবে পেয়েছি। আবার একদিন আড়ং এর সামনে বিএমডব্লিউ চেপে আসা এক ছোটলোক-কে দেখেছিলাম। আপনার জানা সংজ্ঞায় সে হয়তো অনেক বড়লোক। সে হিসেবে পৃথিবীর সবচাইতে বিত্তশালী ব্যক্তি যদি সর্বোচ্চ মাপের বড়লোক হয় তাহলে বিল গেটসের তুলনায় আপনি কতটা ছোটলোক একবার ভেবে দেখেন!

এই তো গেলে বড়লোক শব্দটার একটা বিভ্রান্তিকর দিক। আরেকটা দিক হচ্ছে, এই দেশে 'বড়লোক' শব্দটা নিন্ম ও মধ্যবিত্ত্বের মানুষেরা মোটামুটি গালির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। এই দেশে নিন্ম ও মধ্যবিত্তের লোকজন তাদের থেকে সামান্য উচ্চবিত্তের কারো ক্রয়ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে 'এহ! বড়লোকি দেখায়!' টাইপ কথাবার্তা খুব সহজেই বলে ফেলে। যেন বড়লোক হওয়াটা বিরাট অপরাধের ব্যপার। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সম্পদ যেহেতু সীমিত সেহেতু একজন বিত্তশালী হলে অন্যজন বিত্ত হারাবে। কিন্তু যে সিস্টেমের কারণে একজন বিত্তশালী হচ্ছে অন্যজন বিত্ত হারাচ্ছে, সেই সিস্টেমের বিরুদ্ধে কিন্তু এরা টু শব্দটিও করবে না বরং সেখানে তেল মালিশ করতে ও সেই সিস্টেমের জ্বালানী হতে দুই পায়ে খাড়া। অক্টোপাসের মত আটটা পা থাকলে আট পায়েই যে খাড়া হয়ে থাকতো তাতেও কোন সন্দেহ নেই। আবার, যে 'বড়লোক'-দের সে দেখতে পারে না সেই বড়লোক হওয়ার জন্য হেন কোন চেষ্টা নাই যেটা সে করতে বাকী রাখে। এই যে স্ববিরোধীতা, এই যে হিপোক্রেসী... এটাই যে অবচেতন মনে তাদেরকে 'ছোটলোক' বানিয়ে রাখছে তা তারা বুঝতে পারছে না বলেই মনে হয়। এবং এর ফলেই নিজের বিত্তহীনতার বিপরীতে বিত্তবানদের 'বড়লোক' ভাবতে শিখছে হয়তো। জানি না মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে একটা মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করবে কিনা, কিন্তু এটা যে সুস্থতা নয় সেটা প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলা চলে।

সুতরাং তৃতীয় এই শ্রেনীর বিরোধটা নিতান্তই মানসিক অসুস্থতার ফল হিসেবে ধরে নেয়া যায়।


Thoughts