চীনের আফিম যুদ্ধ ও বাংলাদেশ

ইংরেজরা যখন আমাদের এই উপমহাদেশে আসে তখন তাদের জন্য এই অঞ্চল দখল করা খুব সহজ ছিলো, কারণ এ এলাকার শাসকরা জনগণকে কখনো শিক্ষিত করার চেষ্টা করেনি। তাদের ভেতরে দেশ প্রেম, ঐক্য ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার মত কিছু করেনি বরং জনগণকে মূর্খ রেখে কিভাবে আরো বেশিদিন শাসন করা যায় সে চেষ্টাই করেছে। যার ফলে ইংরেজরা খুব সহজে এই অঞ্চল দখল করে নিতে পেরেছিলো। মীর জাফর যখন নবাব সিরাজ উদ্দৌলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদের হাতে আমাদের স্বাধীনতা তুলে দিলো তখন সাধারণ মানুষ সেটা নিয়ে দুই মিনিটও মাথা ঘামায়নি। ইংরেজরা এখানে এসে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আমাদের মানসিকতা এমন ভাবে বদলে দেয়ার জন্য কাজ করতে শুরু করে যাতে আমরা শতকের পর শতক/ শতবর্ষ ধরে গোলামি করে কাটাই। ইংরেজরা এতে এতই সফল ছিলো যে আমাদের ভেতরে এখনো ইংরেজদের ঢোকানো দুষণগুলো কাজ করে যাচ্ছে।

চীনা শাসক ও জনগণের অবস্থা আমাদের এখানকার মত ছিলো না। তারা অনেক আগে থেকেই জ্ঞান চর্চায় এগিয়ে ছিলো এবং চীনা শাসকরা তাদের অঞ্চলগুলোকে সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ন করে গড়ে তুলেছিলো যে কারণে পশ্চিমারা ওখানে সুবিধা করে উঠতে পারছিলো না। বৃটিশসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো চীনে ঢোকার জন্য অনেক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো তখন তারা গবেষণা করে দেখলো যে- চীনে আফিমের ব্যবহার আছে যেটাকে কাজে লাগানো সম্ভব। চীনারা সপ্তম-অষ্টম শতকের দিকে আরব এবং তুরস্ক থেকে আফিম আমদানি শুরু করেছিলো যেটা মূলত স্বল্প মাত্রায় বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হত। আফিমের মাত্রা বাড়িয়ে একে মাদক হিসেবে ব্যবহার তখনো ওখানে শুরু হয়নি। বৃটিশরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে এই আফিম ব্যপক হারে ওখানে পাঠাতে শুরু করে এবং মাদক হিসেবে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। অভিজাত শ্রেণী মাদক হিসেবে আফিমকে ব্যপকভাবে গ্রহণ করলো। এই মাদক গ্রহণের হার ধীরে ধীরে সবার ভেতরে ছড়িয়ে গেল এবং এটা এত বৃদ্ধি পেল যে চাহিদা মেটাতে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ওখানে ব্যপকভাবে আফিমের চোরাচালান শুরু হয়।

১৮০০ সালের দিকে আফিম চোরাচালান ও এর নেশার ক্ষতিকর দিকটা বুঝতে পেরে চীনা সম্রাট চিয়া চিং আফিমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু ততদিনে চীনে এত বেশি মানুষ আফিমে আসক্ত হয়ে যায় যে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিলো। এর ভেতরে বেশ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আর কিছু দুর্নীতিবাজ রাজকর্মচারী বিষয়টাতে জড়িয়ে যায়। তখন উৎকোচের (ঘুষ) মাধ্যমে চলতে থাকে আফিমের চোরাচালান । ফলে আইন শুধু আইনই থেকে গেল। বাস্তবে বিফল এ আইন দিনে দিনে বাড়িয়ে দেয় আফিম চোরাচালন। ১৮০০ খৃষ্টাব্দে চীনে যে আফিমের আমদানির পরিমান ছিলো ২০০০ মাত্র বিশ বছরেই সেটা ১০,০০০ পেটিতে দাঁড়ায় এবং পরবর্তী দশ বছরে (১৮৩০) তা দ্বিগুন হয়ে ২০,০০০ পেটিতে এবং পরবর্তী ৮ বছরে তারো দ্বিগুন হয়ে ৪০ হাজার পেটিতে দাঁড়ায়। এক পেটিতে ১৪০ থেকে ১৬০ পাউন্ড পর্যন্ত আফিম থাকতো। এভাবে চলতে চলতে এক পর্যায়ে এমন অবস্থা হলো যে চীনের কোয়াংটুং এবং ফুকিয়েন প্রদেশে ১০ জনের ৯ জন লোকই আফিমের নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

আফিমের নেশা চীনের যুবসমাজ ও অর্থনীতি ধ্বংসের চুড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। অর্থনৈতিক সংকট যখন চরমে উঠে তখন জীবন যাত্রার মান যাতে নীচে নেমে না আসে সে জন্য ভূ-স্বামীগণ ভূমি করের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। তাতে দেশে আরো বেশি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে মাঞ্চু সরকার আফিমের চোরাচালান বন্ধের চুড়ান্ত পদক্ষেপ ছাড়া আর কোন উপায় দেখলেন না। সুতরাং মাঞ্চু সম্রাট চিয়া চিং ক্যান্টন বন্দরে একজন যোগ্য ও দেশ প্রেমিক কর্মকর্তা লিন-সে-সু (খরহ-ঞংব-ঝঁ) কে নিয়োগ দেন। লিন-সে-সু দ্রুত গতিতে এই আফিম ব্যবসা বন্ধ করার জন্য বিদেশী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কঠোর আইন তৈরি করে। সেই আইনগুলি হলো-

কোন বিদেশী যুদ্ধজাহাজ চীনে প্রবেশ করতে পারবে না।
বিদেশী ফ্যাক্টরিগুলিতে কোন বন্দুক বা অস্ত্রসস্ত্র রাখা চলবে না।
বিদেশীদের সমস্ত জাহাজ চীনে রেজিষ্ট্রি করাতে হবে।
প্রতিটি বিদেশী ফ্যাক্টরিতে চীনা ভৃত্যের সংখ্যা বেধে দেওয়া হবে।

অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ রাজকর্মচারীদের দ্বারা এই আইন বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়াতে ১৮৩৯ সালে ১০ ই মার্চ ৫৪ বছর বয়সী লিন-সে-সু ক্যান্টন শহরের যে অঞ্চলে বিদেশী বাণিজ্য সংস্থাগুলো গড়ে উঠেছিল সেই অঞ্চল তিনি অবরোধ করেন। বণিকদের নিকট রক্ষিত সকল বেআইনী আফিম ছিল তা তিনি তাঁর হেফাজতে সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। বিদেশী বণিকরা পরিস্থিতির চাপে পড়ে ২০,০০০ পেটি আফিম লীনের কাছে জমা দিতে বাধ্য হয়। ১৮৩৯ সালে ২ জুন লিন-সে-সু জন সমক্ষে লবন ও চুন দিয়ে বিশাল পরিমাণ আফিম ধ্বংস করে দেন। যার বিনিময় মূল্য ছিল প্রায় ৬ মিলিয়ন টেইল। এই এই ঘটনা ও আরো ছোট খাটো কিছু বিষয়কে পুঁজি করে ব্রিটিশরা ওখানে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয় যা চীনাদের কাছে 'আফিমের যুদ্ধ' হিসেবে পরিচিত। প্রথম আফিমের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় প্রায় তিন বছর ধরে (1839–1842) যাচ্ছেতাই মার খায় চৈনিক সৈন্যরা। অন্যদিকে দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় চার বছরব্যাপী (1856–1860) যা চীনাদের ভাগ্যবদল করতে পারেনি। এ যুদ্ধ চীনাদের কাছে আফিমের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত হলেও পশ্চিমা বণিকদের নিকট এ যুদ্ধ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ। অর্থাৎ একই যুদ্ধ দুই পক্ষের নিকট ভিন্নভাবে পরিচিতি পেয়েছে বা পরিচিত করানো হয়েছে।

প্রথম দিকে ইংরেজদের পক্ষে চার্লস পালমার্স্টোন আক্রমণ পরিচালনা করলেও পরবর্তীকালে চার্লস ইলিয়ট ও জর্জ ইলিয়টকে ইংরেজ নেতৃত্বে আসতে দেখা যায়। অন্যদিকে চৈনিক সৈন্যদের পরিচালনার দায়ভার বর্তায় দাগুয়াং, লিনেকজু, কিশাং, ইয়াশাং এর মত কুশলী সেনানায়কের। তবে নেশাগ্রস্ত সৈন্যদের অপারগতা তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিলো। বিশেষত ইংরেজরা এ্যাডমিরাল ইলিয়টের নেতৃত্বে প্রচুর সৈন্য ও অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে ১৮৪০ সালে চীন আক্রমণ করে। আফিমের নেশায় আসক্ত চীনারা এই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি। প্রায় ২০ হাজার চীনা সৈন্য ও ৫০০ বৃটিশ সৈন্য নিহতের মাধ্যমে বৃটিশরা এই যুদ্ধে জয় লাভ করে। পরাজিত চীনা সম্রাট চিয়া চিং ইংরেজদের অনেক অপমানজনক শর্ত মেনে নিয়ে বৃটিশদের সাথে একটি অসম চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। চুক্তিটি ননকিং চুক্তি নামে পরিচিত। দিনটা ছিলো ১৮৪২ সালের ২৯ আগস্ট। এ অসম চুক্তি পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে বৃটিশাধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে জাপান, তাইওয়ান, চীন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমুন্দ্র বন্দরগুলোতে তখন থেকেই ইউরোপীয় আধিপত্যের সূচনা। আর এক্ষেত্রে স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো চীনের দুর্গতির মূলে ছিলো বিষাক্ত আফিমের মরণনেশা। যে নেশা ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলো পুরো চীনকে। প্রতিপক্ষের দুর্বল আক্রমণও অনেক বড় হয়ে দেখা দেয় তাদের সামনে। মরণ নেশায় আসক্ত জাতি মাথা নুইয়ে মেনে নিয়েছিলো অপমানজনক চুক্তি।

এবার আসি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। চীনা সম্রাটরা এত প্রজ্ঞা সম্পন্ন হওয়া স্বত্বেও সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ন চীনকে রক্ষা করতে পারেনি মাত্র একটা নেশার ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানটা আসলে কোথায়? কিছুদিন আগে বিজিবি ও বিএসএফের একটা বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে থাকা ফেন্সিডিলের কারখানাগুলো বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছিলো। বিএসএফ এই প্রস্তাবে রাজী হয়নি। এ কারখানাগুলোতে যে ফেন্সিডিল তৈরি হয় সেগুলো ভারতের ভেতরে ওরা ঢুকতে দেয় না। সীমান্তে প্রায়ই শুনবেন গরু ব্যবসায়ীদের গুলি করে মেরে ফেলছে বিএসএফ। কোনদিন শুনবেন না যে ফেনসিডিল চোরাচালানকারীদের মেরেছে। এর ভেতর আবার যুক্ত হয়েছে ইয়াবার মত ব্যপক বিধ্বংসী নেশা, আফিম যেগুলোর কাছে নেহায়েত শিশুতোষ নেশা।

আফিমের মত সামান্য যে নেশা চীন জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো তার চাইতে ভয়ংকর নেশা থেকে আমাদের দেশকে বাঁচানোর উপায় কী? বাংলাদেশের ভবিষ্যতটা আসলে কোথায় যাচ্ছে? বাংলাদেশ যে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেটা থেকে বাঁচার কোন চেষ্টা বা চিন্তা আমাদের সরকার, বুদ্ধিজীবি ও শিক্ষিত সমাজের ভেতরে নাই বললেই চলে। যাহোক, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা নিজ নিজ গন্ডিতে মাদক ও দেশ বিরোধী তৎপরতাগুলো বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারি। আপনি যদি শুধুমাত্র নিজে নেশা থেকে দূরে থাকেন ও বন্ধুদের দূরে রাখতে পারেন তাহলেও দেশটা রক্ষা পেতে পারে। এটা আপনার, আমার, আমাদের সকলের দায়িত্বের ভেতরে পড়ে।

* ফেসবুক নোটরেডিও তেহরানে প্রকাশিত।


Thoughts