বাংলা ব্লগকে নোংরামি মুক্ত রাখার আন্দোলন

বাংলা ব্লগে আমরা যতটা উৎসাহ নিয়ে এসেছিলাম, বিশেষ করে যে উৎসাহটা আমার নিজের ছিলো সেটা ধীরে ধীরে কমতে থাকলো। সেময়ে ইয়াহু চ্যাট গ্রুপগুলো যারা ব্যবহার করতেন তারা জানেন বাঙলাদেশি রুমগুলোর কি অবস্থা ছিলো। গালাগালি আর ব্যক্তিগত আক্রমনের আখড়া ছিলো ওগুলো যে কারণে আমরা ইয়াহু চ্যাট গ্রুপগুলো ছেড়ে IRC-তে ভীর জমাই। বাংলায় ব্লগ লিখতে এসেও দেখলাম পরিস্থিতি অনেকটা ইয়াহু গ্রুপগুলোর মত। যদিও তখনো অতটা গালাগালি শুরু হয়নি, কিন্তু বাঙালিদের আচরণ হতাশাজনক ছিলো। ২০০৬ সালে এরকমই নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কেটে গেল বাংলা ব্লগিংয়ে আমাদের প্রথম বছর। পুরো বছরের সামারি পাওয়া যাবে এই পোস্টে।

সামহোয়্যারইন FACT 2006

০১ লা জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৮:২২

সবাই 2006 শেষ হবার আগেই 2006 নিয়ে পোষ্ট দিয়ে ফেলেছে। আমি পুরো 2006 শেষ হবার পর দিলাম। 2006 এর পুরোটা না হ্যেলও নয়টি মাস ছিলাম এখানে। এর ভেতর যেসব FACT আমার চোখে পড়েছে সেগুলো অল্প কথায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি-

  1. কতৃপক্ষ বিনা পয়সায় সার্ভিস দিচ্ছে জনগনের গালি খাওয়ার জন্য।
  2. দিনের পর দিন মুসলমানদের অনুভুতিতে আঘাত করা পোষ্ট নিয়ে কতৃপক্ষ নীরব থাকলেও কতৃপক্ষরে কেউ নাস্তিক দাবী করে না.. কিন্তু কয়েকদিন ইসলাম পন্থীদের পোষ্ট একটু বেশী হইলেই দোষ কতৃপক্ষের। কতৃপক্ষ রাজাকার!!
  3. পৃথিবীর সকল ডিসকাসন সাইটেই ইগনোরিং সিষ্টেম ও মডারেশন থাকতে পারলেও এইখানে থাকলেই বাক স্বাধীনতা খর্ব হয়।
  4. আমি গালি দিলে হয় বাক স্বাধীনতা.. আর অন্যে আমারে গালি দিলে হয় এ্যবিউজ..
  5. যুক্তিতে না পারলে ফালতু কথার উপর কোন জিনিসই নাই। এইটাকে আবার স্যাটায়ার বইল্যা চালিয়ে দেয়া যায়...
  6. নিজেকে প্রগতিশীল(!) প্রমান করতে হইলে অবশ্যই চ' রেটেড হইতে হইবেক (মানে প্রচুর গালাগালি জানা ও প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকতে হবে)
  7. একজন নতুন ব্লগার ঢুকে গালাগালি কলেই সেইটা হয় হাবিবমহাজন অথবা শাওন অথবা ত্রিভুজের নিক। কিন্তু কিছুদিন পর যখন দেখা যায় সেই চ' রেটেড (গালিবাজ) ব্লগার ফজলে এলাহী, শাওন, ত্রিভুজ বা আস্তমেয়েকে গালি দিচ্ছে তখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকাটাই শ্রেয়।
  8. মানুষের পেছনে লেগে থাকাটাই এখানে সবচেয়ে বড় গুন হিসেবে দেখা হয়। কে কত জ্ঞানী ব্লগার তা এই নিক্তিতেই মাপা হয়।
  9. কেউ যখন সবাইরে ছাগল ও ছাগু উপাধি দিতে থাকে তখন তার পোষ্টগুলো ঘাটলেই একটা জিনিষ লক্ষ করবেন...। তার নিজের 80% পোষ্টই ছাগল ও ছাগু বিষয়ক।
  10. আমি অনেক জ্ঞানী (সবাই কয়).. আমি জানি নামের ক্ষেত্রে বানান কোন সমস্যা নয়.. কিন্তু ত্রিভূজ কেন তার নামের বানান 'ত্রিভুজ' লিখব.. এইটা নিয়া আমার আপত্তি আছে। এইরকম কতাবার্তা কইয়া অনেকের কাছে আমি গুরু হইয়া গেছি।
  11. 'নু্যড ছবি আমার কাছে অশ্লীল লাগে না। আরবি ভাষাটাকে অশ্লিল লাগে...' এইরকম কইতে পারলেই আপনি ব্লগের সবচেয়ে প্রগতিশীল জ্ঞানী ব্লগার হিসাবে সবার কাছে পরিচিতি পাইবেন।
  12. আমার প্রিয় লোক বানান ভুল ('র' এর যায়গায় 'ড়' এবং 'ড়' এর যায়গায় 'র') করলে সমস্যা নাই.. কিন্তু আমি যারে দেখতে পারি না সে করলেই সমস্যা।
  13. আমার প্রিয় ব্যাক্তি যখন 'আজ বৃষ্টি দেখতে ছাদে গিয়েছি.." টাইপ পোষ্ট দেয় তখন সেটা হয় সাহিত্য... আর আমার অপ্রিয় কেউ দিলেই হয় ন্যাকামী।
  14. আমি বিশাল হেডিং এর পোষ্ট দিলে সমস্যা নাই.. আমার অপ্রিয় কেউ দিলেই প্রতিবাদ!
  15. কেউ 'কাট কপি পেষ্ট' করলে তারে গাইলাইয়া শ্যাষ কইরা ফালামু.. কিন্তু যদি আমার মতের সাথে তার একটু মিল পাওয়া যায় তাইলে কোন সমস্যাই নাই।
  16. লেখার মান কেমন তা জানার সময় নাই.. ঐ ব্যাক্তিরে আমি পছন্দ করি না.. সুতরাং তার পোষ্ট দেখা মাত্রই 1.. আর প্রিয় ব্যাক্তি কপি পেষ্ট মারলেও রেটিং 5
  17. ইংরেজীতে লেখতে পারবেন না... লেখলে আপনারে গাইলাইয়া শেষ্য কইরা ফালামু.. কিন্তু আমরা যাগোরে দেখবার পারি না তাগোরে নিয়া ফালতু কথা ইংরেজী কেন, জাপানী ভাষায় দিলেও সমস্যা নাই...
  18. ব্লগের বেশীর ভাগ যার উপর ক্ষ্যাপা (সেটা যৌক্তিক হোক আর অযৌক্তিক কারনেই হোক) তাকে নিয়ে দুই একটা ফালতু পোষ্ট দিলেই আপনি সুপার হিট।
  19. ইসলাম নিয়ে কয়েকটি পোষ্ট করলেই বিনামূল্যে রাজাকার খেতাব পেয়ে যাবেন।
  20. মেয়ে হয়েও ছেলেদের সাথে সস্তা অশ্লিলতায় মজা পাওয়া ও অংশগ্রহন করা অধিক স্মার্টনেসের পরিচায়ক।
  21. আরো বেশ কিছু FACT আছে... এখন মনে পড়ছে না... পরবর্তিতে যুক্ত করা হবে।
    7:19 PM 01/01/2007 112416


    খুব অল্প সময়ের ভেতরেই বাংলা ব্লগস্পিয়ার দুষিত হয়ে উঠতে শুরু করে। বাংলা ব্লগে নোংরামির প্রতিবাদে আমরা সবসময় সরব ছিলাম। সেসময় ব্লগারদের একটি গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেল যারা ব্লগে আসতোই ব্যক্তিগত আক্রমণ ও নোংরামী করার জন্য। এদের ব্যাকআপ দিতো নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল দাবী করা একটি গ্রুপ যাদের একটা বড় অংশ পরবর্তীতে আমার ব্লগ ও সচলায়তনে চলে যায়। এদের হাত থেকে নতুন ব্লগারদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে লেখা একটি পোস্ট শেয়ার করি।

    এই যে, হ্যা! আপনাকেই বলছি.... (নতুন ব্লগারদের উদ্দেশ্যে)

    ২১ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:২৮

    এই পোষ্টটা মূলত তাদের জন্য দিয়েছি যারা এই ব্লগে নতুন এসে অনেক গালি ও খারাপ ব্যাবহারের সম্মূখিন হচ্ছেন। নতুনদের গালাগালি ও খারাপ ব্যাবহারের মুখে পড়ার কথা নয়, তবুও হচ্ছে। এখানে জয়েন করার পর কেউ যদি একটু একটিভ হয়ে উঠে অথবা একটু পপুলার হয়ে উঠে, তাকেই 'ত্রিভুজের' ক্লোন ঘোষনা করে দেয়া হয়। তারপর এই ব্লগের এক শ্রেণীর তথাকথিত প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধি(!) চর্চাকারী ও মুক্তিযুদ্ধ বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহকারী ব্লগার তাদেরকে উত্যক্ত করে থাকে। সেসব নতুন ব্লগারদের এভাবে অনর্থক হয়রানি হতে রক্ষা করতে কতৃপক্ষ কখনো এগিয়ে আসেনি। সুতরাং তারা বাধ্য হয়ে ব্লগিং বন্ধ করে নীরব পাঠকে রুপান্তরিত হয়ে যান অথবা নীরবে ব্লগ ছেড়ে চলে যান।

    পুরোনো ব্লগার কতৃক অপমানিত হয়ে রাগে ক্ষোভে নীরবে ব্লগ ত্যাগ করা ব্লগারের সংখ্যা কম নয়। তাদের চলে যাওয়ার পেছনে যারা দায়ী, তারা যে সংখ্যায় খুব বেশী তাও নয়। কিন্তু অনেকদিন ধরে এখানে লিখছেন বলে কতৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনরকম ব্যাবস্থা গ্রহন করেন না অথবা কতৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। অনেক নতুন ব্লগারও অনেক সময় এরকম বিরক্তিকর আচরন করে থাকেন। তাদের বিরুদ্ধেও কোন ব্যাবস্থা গ্রহন করার চেষ্টা করলে পুরোনো সেসব বিকৃত রুচির ব্লগাররা প্রতিবাদ করে থাকেন। অনেক সময় ব্লগ ত্যাগ করার হুমকি প্রদান করেন। কতৃপক্ষ বুঝতে চেষ্টা করেন না যে এদের কারনে যে পরিমান লোক এই ব্লগ ছেড়ে চলে গিয়েছে, তারা এদের চেয়েও অনেক বেশী মূল্যবান। তাছাড়া একটি সাইটে নতুন লোক আসবে, পুরোনোরা যাবে এরকমটিই হয়। কিন্তু এই ব্লগে অল্প সংখ্যক পুরোনো ব্লগারের ব্লগারদের জন্য নতুনরা এখানে আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন, যা কাম্য নয়।

    এই সমস্যার সমাধান কতৃপক্ষ কিভাবে করবেন বা আদৌ করবেন কিনা তা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা নাই। ত্রিভুজের সাথে কথায় না পেরে করা গালাগালি ও নোংলা আক্রমনেও ত্রিভুজের কোন সমস্যা হয় না। এসবের মুখে পড়তে হবে জেনেই ত্রিভুজ এখানে লেখালেখি করে। কিন্তু সেসব নিন্মরুচির মানুষগুলো কারো উপর ক্ষেপে তার সমগোত্রীয়দের গালাগালি ও নোংরামির টার্গেটে পরিনত করার লক্ষে 'ত্রিভুজের' ক্লোন ঘোষনা করে নতুনদের যেভাবে কষ্ট দিয়ে থাকে; তার জন্য সত্যিই খারাপ লাগে। এসব কারনে যারা ইতিপূর্বে এই সাইট ত্যাগ করেছেন, যারা বর্তমানে খারাপ ব্যাবহারের সম্মূখীন ও যারা ভবিষ্যতে হবেন, তাদের সবার কাছে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এছাড়া আমার আর কি করার আছে?


    এরপর আরো অনেকে প্রতিবাদ করেন। ব্লগে নোংরামি বন্ধে আমরা দলবদ্ধ হয়ে পোস্ট দিয়েও যখন এদের থামানো যাচ্ছিলো না সেসময় সামহোয়্যারইন কতৃপক্ষ বরাবর এই চিঠিটি লিখি।

    টু সামহোয়্যারইন কর্তৃপক্ষ (ত্রিভুজ)

    ২০ শে মে, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:২১

    সামহোয়্যারইন ব্লগকে কিছু মানুষ তার নিজের বাসার লিভিং রুম ভাবছে। তাদের ইচ্ছে মতই এখানে সব হতে হবে। কোন ব্লগারকে তাদের পছন্দ না হলে সবাই মিলে তাকে নোংরা আক্রমন করে ব্লগ থেকে তাড়ানোর ঘটনা এখানে অহরহ। এই ব্লগে এই অল্প কয়েকজন নোংরা ব্লগারের কঠিন আক্রমনের শিকার হয়ে গত একবছর টিকে আছে এরকম ব্লগার খুঁজে পাওয়া কঠিন (আমি বাদে)। আমাকে নিয়ে গত একবছরে প্রায় ৫০০ নোংরা পোষ্ট হয়েছে। সেসবের মাঝে ২৭৮টি আমার নিজের পিসিতেই সেভ করা আছে। এখানের সব্বোর্চ ব্লগার, পুরানো ব্লগার, এ্যকটিভ ব্লগান নামক যে আজব কালচার চালু রয়েছে, তার যাতাকলে পরে নতুন ব্লগাররা হাবুডুবু খায় প্রায়ই। তাদের মন্তব্যে কষ্ট পায়নি এমন নতুন ব্লগারের সংখ্যা হাতে গোনা। তবুও সেই অল্প কিছু তখাকথিত পুরানো ব্লগারকেই মাথায় নিচে নাচেন সামহোয়্যারইন কতৃপক্ষ।

    হাসিন ভাইকে একদিন বলেছিলাম এই অল্প কিছু ব্লগারের জন্য আপনাদের সাইটের রেপুটেশন খারাপ হয়ে যাচ্ছে..নতুনরা লিখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। হাসিন ভাই বললেন 'তাদের পলিসি হলো কাষ্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট'! ওয়েল... কাষ্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট মানলাম। কিন্তু নতুন যে ব্লগাররা নিগৃত হচ্ছে প্রতিদিন, তাদের ব্যপারে আপনাদের পলিসি কি? সেই পলিসি তৈরি করা হবে হবে করেও হচ্ছে না। কোনদিন হবে বলেও মনে পড়ে না। এই ব্লগের বাজে পরিবেশের কারনে ব্লগে আসছেন না, এরকম প্রায় একডজন ব্লগার আমার ইয়াহুতে আছেন। বুক মার্কে আছেন আরো কয়েক ডজন ব্লগার। নীরবে কতজন চলে যাচ্ছেন এই বাজে পরিবেশের জন্য, সেটা না হয় নাই বললাম। তবুও সেই পুরানো ব্লগার, সর্বোচ্চা ব্লগার কালচার চালু রয়েছে এখানে।

    কতৃপক্ষের ধারনা এরা চলে গেলে সাইট অচল হয়ে যাবে। হ্যা, এটা কিছুটা ঠিক। প্রথম কয়েকদিন সাইটে একটু কম পাবলিক আসবে। কিন্তু সেই কমটা চোখে লাগার মত নয় বলেই আমার বিশ্বাস। কিছুদিন আগে ৭২ ঘন্টা হরতাল ডাকার পর কি সাইট অচল ছিলো? যারা এসব হরতাল/ব্যক্তিগত আক্রমন ইত্যাদির জন্য দায়ী, এরা চলে গেলেই বরং ভালো। ব্লগে নতুন অনেক মুখের দেখা মিলবে। সবাই ভাল পরিবেশ পেয়ে ভাই বোন ও বন্ধুদের নিয়ে আসবে। ওয়েব সাইট ও ওয়েব ফোরাম মেইনটেইনের আমার আট বছরের অভিজ্ঞতা তাই বলে।

    দেখা যাক, কতৃপক্ষ কি করে। অল্প কয়েকজন গালিবাজ ও হরতাল প্রিয় ব্লগারের কাছে জিম্মি থাকে না সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার নিমিত্তে শক্ত নীতিমালা তৈরি করে সাইটে ফালতু লোকজনের প্রবেশাধিকার রহিত করে। আমরা চেয়ে আছি। পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য। সেটা কবে আসবে জানি না। তবে আমরা আশাবাদী!


    প্রথম দিকে ব্লগ কতৃপক্ষ আমাদের এসব আবেদন এড়িয়ে গেলেও একটা সময় পরে ব্লগের লেখার জন্য লম্বা এ নীতিমালা বানিছিলো। কিন্তু ততদিনে বেশ খানিকটা দেরী হয়ে গিয়েছে। অনেক ব্লগার ততদিনে ব্লগ ছেড়ে চলে গিয়েছে। তারপরেও আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম এই নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ‌্যমে ব্লগের পরিবেশ ঠিক করার ব্যপারে। সামহোয়্যারইনকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই লেখাটা পোস্ট করেছিলাম সেদিন।

    ধন্যবাদ সা.ই.ক... সুন্দর পরিবেশ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র!!

    ০৬ ই জুলাই, ২০০৭ দুপুর ১:২৯

    কে যেনো একদিন মন্তব্য করেছিলেন সামহোয়্যারের জন্য দরকার তত্ত্বাবধায়ক কতৃপক্ষ। তাহলেই এর পরিবেশ ঠিক করা সম্ভব। নি:সন্দেহে মজার মন্তব্য কিন্তু অবাস্তব ছিলো না। দিনের পর দিন গালাগালি ও নোংরামি এই সাইটাকে যেভাবে কলুষিত করেছিলো এবং নোটিশবোর্ড যেভাবে এসব ব্যাপারে নিরবতাটা পালন করেছিলো, তাতে সত্যিই একটা তত্ত্বাবধায়ক কতৃপক্ষের প্রয়োজন অনুভুত হচ্ছিলো।

    যাই হোক, অবশেষে কতৃপক্ষের ঘুম ভেঙেছে। সেজন্য ধন্যবাদ জানাই। তবে অনেক দেরী হয়ে গেল। তাদের সিন্ধান্ত নিতে এই বিলম্বের কারনে যে ব্যাপারগুলো ঘটে গেলো, সেগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করি-
    ১) গালাগালি এবং নোংরামীর কারনে একে একে অনেক ব্লগার লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছেন, অনেকে সাইট ছেড়ে চলে গিয়েছেন, অনেকে তার পরিচিতদের এখানে আসতে বারণ করেছেন এবং অন্যদের এই সাইটে আসার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছেন।
    ২) বাজে পরিবেশের কারনে মেয়ে ব্লগাররা এখানে নিরাপদ বোধ করেন না। গালিবাজদের পাশাপাশী নারী স্বাধীনতা ও ইভ টিজিং নিয়ে লম্বা লাম্বা কথা বলা অনেক বিবেকবান(!) ব্লগারকেও দেখা গিয়েছে কোন এক মেয়েকে আক্রমন করে করা নোংরা পোষ্টে গিয়ে পরোক্ষ সমর্থন ব্যাক্ত করতে। ফলাফল, নারী ব্লগারের সংখ্যা শূণ্যের কাছাকাছি।
    ৩) ভাল ব্লগারের অভাবে সাইটে ভাল লেখার পরিমান কমে গিয়ে ফালতু লেখা বেড়ে গিয়েছে দিন দিন। এর ভেতর সংখ্যাগরিষ্টের আবেগে আঘাত করে (কোরানের ভুল উপস্থাপন ও ফেব্রিকেটেড আয়াত দিয়ে) জঘন্য কিছু মিথ্যাচার মূলক পোষ্ট হয়েছিলো যা সাইট থেকে যথাসময়ে সরিয়ে নিতে ব্যার্থ হয়েছিলো কতৃপক্ষ। এমনকি একটি পোষ্টকে সরিয়ে নেয়ার পর আবার ফিরিয়েও আনা হয়েছিলো যাতে অনেকেই মনে কষ্ট পেয়েছেন। ফলাফল হিসেবে ইসলাম প্রিয় নীরব পাঠকরা এখানে আসা কমিয়ে দিয়েছে..। বলা বাহুল্য এদেশের বেশীর ভাগ মানুষই ইসলাম নিয়ে ফালতু কথা সহ্য করাতে রাজি নয়। স্বভাবতই ভিজিট কমে যেতে লাগলো এবং আলেক্সাতে রেংক হারাতে শুরু করলো সামহোয়্যারইন। (এটা গত বেশ কয়েকমাস ধরেই ঘটছে... সম্প্রতি এই হার আরো বেড়েছে)।
    ৪) বিভিন্ন ফোরাম ও অনলাইন গ্রুপে এই সাইট সম্পর্কে নেগেটিভ প্রচারনা চলতে থাকলো। কারন এখানে ব্যাপক নোংরামী চর্চা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগে আঘাতকারী লেখা হচ্ছিলো। সেসব মডারেশনেও কতৃপক্ষের সীমাহীন উদাসীনতা লক্ষ করা গিয়েছে। ফলাফল, এই সাইট সম্পর্কে লোকজনের মাঝে প্রচুর নেগেটিভ ধারনা তৈরি হয়েছে।
    ৫) নতুন ব্লগারদের বিভিন্নভাবে হ্যারাজ করা হয় এবং কতৃপক্ষ এই ব্যাপারেও চুপ। ফলশ্রুতিতে নতুন ব্লগাররা দ্বিতীয়বার এখানে আসার উৎসাহ পান না এবং আস্তে আস্তে নতুন ব্লগার আসা মোটামুটি বন্ধ হয়ে আছে এখন। (সাইট কতৃপক্ষের কাছে এব্যাপারে ভাল পরিসংখ্যান রয়েছে.. আমার আর বলার প্রয়োজন নেই।)
    ৬) প্রায়ই দেখা যেতো রাতে যেকোন একজন এ্যাকটিভ ব্লগারকে টার্গেট করে তাকে এমন ভাবে অপমানিত করা হয়, যাতে সে পুনরায় এখানে আসার ব্যপারে উৎসাহ না পায়। ফলাফল, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর ব্লগারই রয়ে গেল এখানে। বাকীরা সব আউট। বলা বাহুল্য, সেই নির্দিষ্ট শ্রেণীর ব্লগাররা সব গালিবাজ ও ফালতু ব্লগার।
    ৭) ব্লগে গালিবাজ ও ফালতু ব্লগারের সংখ্যা অধিক হয়ে গেল। সুতরাং তাদের সমল্লিত আক্রমনের মুখে ভিন্ন মতের নতুন ব্লগার আসা একদমই বন্ধ হয়ে গেল।
    ৮) সেই গালিবাজের দল বিভিন্ন সময়ে ফলস সব ইস্যু সৃষ্টি করে ব্লগে গোলমাল সৃষ্টি করতে লাগলো। কিছুদিন আগে তাদেরই একজন 'ইসলামী শাসন' নিক রেজি: করে নিজেরাই গোলাম আজমের ছবি পোষ্ট করে সেটা নিয়ে ব্লগে ধর্মঘট ডাকার মত হাস্যকর কাজকর্ম করেছিলেন। (কতৃপক্ষ খুব ভালই জানেন সেই নিকের কাহিনী... )।
    ৯) অবশেষে আরেকটি আজাইরা ইস্যু সৃষ্টি করে সব গোলমাল সৃষ্টিকারী ব্লগারের দল ব্লগ ত্যাগ করলেন। কিন্তু তাদের গালি দেয়ার নিকগুলো এখানে এ্যাকটিভ রাখলেন যাতে এখানের পরিবেশ উন্নতি না হয় এবং নতুন ব্লগার না আসতে পারে। ফলাফল, বর্তমান পরিস্থিতি।
    ১০) সর্বশেষে কতৃপক্ষের ঘুম ভাঙলো এবং নতুন নীতিমালা ঘোষিত হলো। খুব স্বাভাবিক ভাবেই গালিবাজ ব্লগারদের ভৌতিক নিকেরা সেটার বিরুদ্ধে বলতে শুরু করলো। সেই প্রচার এখনো চলছে....

    এখানে দেয়া ১০ টি পয়েন্ট যে একটুও ভুল নয়, তা কতৃপক্ষ খুব ভালই জানেন। তবুও আমি এর প্রতিটি পয়েন্টের পক্ষে একাধিক প্রমাণ দেখাতে পারবো। আমার কাছে ব্লগের বেশীর ভাগ পোষ্টেরই ব্যাকআপ রয়েছে.. গালাগালি ও ব্যাক্তিগত আক্রমন মূলক পোষ্টগুলো আলাদা আলাদা ফোল্ডারে সেভ করে সিডিটে বার্ন করে রাখা আছে। কেউ পোষ্ট মুছে ফেলে সাধু সাজার চেষ্টা করে লাভ নেই... সব গালিবাজদেরকেই খুব সহজে ধরে ফেলা যায় সেসব থেকে।

    এবার বর্তমান পরিস্থিতিতে কতৃপক্ষের করনীয় সম্পর্কে আমার কিছু মতামত পেশ করি-
    ১) ব্লগে পুরো খালি হয়েগেলেও ব্লগের বর্তমান অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের সব গণহারে ব্যান করে দেয়া উচিত। এবং সেটা একই সাথে, যাতে বাকীরা চিৎকার চেঁচামেচি করার সুযোগ না পায়। এতে হয়তো ব্লগ কিছুটা স্থবির হয়ে পড়বে। তবে তা খুবই অল্প সময়ের জন্য। আমাদের ব্লগ ইয়াহু গ্রুপ থেকে শুরু করে যত লিংক রয়েছে, সেগুলো মারফত সবাইকে জানিয়ে দেয়া যাবে ব্লগে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই তখন একে একে ব্যাক করবে এবং নতুন অনেক ব্লগার আসবে। (তবে পুরানো গালিবাজদের কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করে বা নিজের পুরানো ফালতু পোষ্টগুলো মুছে দিয়ে নতুন ভাল ভাল পোষ্ট দেয়ার অঙ্গীকার করলে তাকে ব্যান হতে রেহাই দেয়া যেতে পারে।)
    ২) কিছু ব্লগার আছে যারা বছরে একবার বা দুইবার এখানে আসে.. তাও শুধুই গালাগালির জন্য বা কাউকে আক্রমন করার জন্য, তাদেরকে খুঁজে বের করে সাসপেন্ড করে দেয়া উচিত। (কাদেরকে ব্যান করা উচিত তার একটা পূর্নাঙ্গ লিষ্ট আছে আমার কাছে। প্রমাণ সহকারে। আরিল ভাই চাইলে দিতে পারি।)
    ৩) কিছু ব্লগার আছে যাদের ব্লগে মৌলিক কোন রচনা নেই। তাদের পুরো ব্লগ জুড়েই অন্যকে আক্রমন করা সব পোষ্ট। তাদের ব্লগ সরাসরি সাসপেন্ড করে দেয়া উচিত।
    ৪) নতুন পরিবেশে নতুন নীতিমালা শক্তভাবে পালন করতে হবে। কে নীতিমালা ভঙ্গ করলো তা দেখলে চলবে না, সরাসরি এ্যাকশন নিতে হবে।
    ৫) সপ্তাহের সেরা ব্লগার সিষ্টেমটা একটু মডিফাই করে আবার চালু করা হোক। সেটা সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে পাক্ষিক করা হোক। সেরা ব্লগার বাছাইয়ের জন্য ব্লগারের আচরন, অন্যের ব্লগে করা মন্তব্য সংখ্যা, নিজের ব্লগে প্রাপ্ত মন্তব্য সংখ্যা, প্রাপ্ত রেট, দেয়া রেট, পোষ্ট সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনা করা যেতে পারে। ফলাফল স্বরুপ ব্লগারদের মাঝে ইন্টারেকশন বাড়বে।
    ৬) প্রতি মাসে অথবা প্রতি তিন মাসে একটি সেমিনার বা গেটটুগেদারের ব্যাবস্থা করা হোক। তাতে ব্লগারদের মাঝে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে। এব্যাপারে অনেকদিন আগে আমি একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম। সবাই সেখানে সম্মতি জানিয়েছিলো।
    ৭) ব্লগের সেরা লেখাগুলো নিয়ে প্রতিবছর একটি সাময়িকী বের করা যেতে পারে (এটা অপশনাল.. মামা বাড়ির আবদার ধরা যেতে পারে.. )
    ৮) প্রতি মাসে গুড ব্লগার ও ব্যাড ব্লগার লিষ্ট প্রকাশের ব্যাবস্থা করা যেতে পারে। তাতে কেউ কাউকে অযথা ব্যাক্তিগত আক্রমন বা গালি দেয়ার আগে একটু হলেও ভেবে নিবে।
    ৯) প্রতি ব্লগারের জন্য ওয়ার্নি লেভেল সেট করার ব্যাবস্থা রাখা যেতে পারে। কোন ব্লগারের আচরন যদি খারাপ কিন্তু ব্যান করার মত যথেষ্ট না হয়, তখন ওয়ার্নি লেভেল সেট করে দিবে মডারেটর বা এডমিন। সেই ব্লগার কোথাও মন্তব্য করলে তার ওয়ার্নি লেভেলও দেখাবে। তাতে খারাপ আচরনের ব্লগারদের চিহ্নিত করতে সুবিধা হবে এবং নতুন ব্লগাররা খুব বেশী আপসেট হবে না পুরানো কারো আক্রমনের মুখে পড়ে।

    আরো বেশ কিছু ব্যাপার ভেবে রেখিছিলাম.. আপাতত এই কয়টাই মনে আসছে। বাকীগুলো মনে পড়লে যুক্ত করবো পরবর্তীতে...। তবে এই কয়টা ব্যাপার নিয়ে কতৃপক্ষ ভাবতে পারেন। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্লগের পরিস্থিতি আবার আগের মত হয়ে যাবে সন্দেহ নাই। সেই সাথে নতুন নতুন ব্লগারদের গুঞ্জনে ব্লগ প্রঙ্গন ভরে উঠবে। দিনে দিনে এই ব্লগ হয়ে উঠবে সুন্দর ও সুস্থ চিন্তা চর্চা করার অন্যতম মাধ্যম।

    শুধু কতৃপক্ষেরই নয়, আমারা যারা ব্লগার, তাদেরও বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। সেগুলো সম্ভবত আমার বলে দেয়ার প্রয়োজন নেই। কারন এখানে যারা সুন্দর সুন্দর পোষ্ট দেন ও চমৎকার চিন্তা ভাবনার প্রকাশ ঘটান, তারা সকলেই আমার চেয়ে অনেক বেশী জানেন, বেশী বুঝেন এবং বেশী জ্ঞানী। তাই চলুন আমরা আমাদের জ্ঞানের সঠিক ব্যাবহার করি। সবার সুন্দর প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা চমৎকার একটি ব্লগ পেতে পারি যা হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিতে পারবে। আসুন অযথা অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট না করে গঠন মূলক চিন্তা ভাবনা করি, যা আমাদের দেশের ও সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।

    সবাই সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন।
    ত্রিভুজ

    সামহোয়্যারইনে দেয়া এই লেখাটার মূলকপির নিচে ব্লগ নিয়ে আমাদের আন্দোলনের বেশ কিছু লিংক যুক্ত করা আছে। আগ্রহীরা দেখার জন্য এখানে ক্লিক করতে পারেন।


Thoughts