প্রিয় তাতিয়ানা - ভূমিকা

বেসিক ম্যানার, কার্টেসি, কমনসেন্স, মানবতা, ভালো-মন্দের পার্থক্য... এইসব বোঝার জন্য এই দেশে তেমন ভালো কোন টেক্সট নাই। যাও আছে, খুব বিচ্ছিন্নভাবে লেখা। তাই 'প্রিয় তাতিয়ানা' নামে একটা বই লেখার পরিকল্পনা করছিলাম গত কয়েক বছর ধরে। মূলত আমার সারাজীবনের পড়াশোনা-চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে লেখা হবে বইটা। মোটামুটি ইজম নিরপেক্ষ... কোন বিশেষ ধর্ম বা মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত কিছু না। এবং যেহেতু খুব উপদেশমূলক ও নিজস্ব চিন্তা-চেতনা নির্ভর বই হবে তাই ঠিক করেছিলাম বইটার মাত্র একটা কপি ছাপাবো। শুধুমাত্র তাতিয়ানার জন্য। কারণ, বইটাতে যে ভঙ্গিতে লেখার পরিকল্পনা করেছিলাম সেটা অনেকের ভালো নাও লাগতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো খুব জোর দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করার পক্ষে নই। আমার লেখালেখির একটা বড় উদ্দেশ্য মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, মানুষের উপরে আমার চিন্তা-ভাবনা চাপানো নয়। কিন্তু একটা বাচ্চার জন্য সেটা খুব কার্যকর পন্থা নয় বিধায় বইটার একটাই কপি ছাপানোই ভালো মনে হয়েছিলো। তারপর, বেশকিছু পরিচিতজন ও বন্ধু-বান্ধবকে এই পরিকল্পনার কথা জানালাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে তাদের সকলেই বলে বসলো তাদের জন্য হলেও এক কপি অতিরিক্ত ছাপাতে। তারপর মনে হলো- আচ্ছা, ব্লগে লিখলেই তো পারি। যার ইচ্ছে হলো পড়লো, যার ইচ্ছে পড়লো না। পুরোটা লেখা শেষ হওয়ার পর না হয় বই হিসেবে কিছু কপি ছাপিয়ে নিলাম। ফেসবুকেও এর ভেতরে একটা ঘোষণা দিলাম। সেখানেও অনেকে উৎসাহ দেখালেন। সুতরাং লিখতে শুরু করলাম।

লিখতে শুরু করার পর আবিষ্কার করলাম, বাচ্চাদের উপযোগী এধরনের বই লেখা খুব কঠিন কাজ। বিশেষ করে যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মাথায় আসতে থাকলো, সেগুলো কোন বাচ্চার পক্ষে বোঝা খুব কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া একটা বাচ্চার জন্য বই থেকে পড়ে কিছু শেখার বয়স হতে হতে অনেক সময় চলে যাবে। তার আগেই সে পরিবার থেকে অনেক কিছু শিখে ফেলে এবং এই সময়টা অনেক গুরুত্বপূর্ন। আবার পড়তে জানা বাচ্চাদের জন্য লিখলেও সেটা বাচ্চাদের উপযোগী করতে গেলে লেখার মূল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। কি করা যায় ভেবে অবশেষে মনে হলো- বাচ্চাদের জন্য না লিখে বাচ্চার বাবা-মায়ের জন্য লিখি। তাতে বাচ্চাদেরও শেখা হলো আবার বাচ্চাটা বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখবে তখন পড়ে নিয়ে কাজে লাগাতে পারবে।

বাচ্চাদের জন্য সরাসরি না লিখে তাদের বাবা-মায়ের জন্য লিখবো ঠিক করলেও লেখার যে ভঙ্গিটা নিয়ে ভেবেছি সেটাই বজায় রাখবো ভাবছি। এই যেমন বইটাতে একজন বাবা তার মেয়েকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলছে, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিচ্ছে বলে মনে হবে। এক্ষেত্রে যিনি পড়বেন, আমার জায়গায় তিনি নিজেকে কল্পনা করে নিলেই সমস্যা মিটে যায়। যেহেতু খুব বেশীদূর লেখা হয়নি, সেহেতু এখনি চাইলে ভাষার এই দিকটা পরিবর্তন করে দেয়া উচিত কিনা ভাবছিলাম। তারপর মনে হলো, 'প্রিয় তাতিয়ানা...' বলে লেখা শুরু করলে সেখানে নিজের মেয়ের জন্য বরাদ্দ যে মমতাটুকু থাকবে সেটা হয়তো সবার বেলায় বলতে গেলে নাও থাকতে পারে। ছোটবেলা ভাবতাম, জগতের সকলের জন্য আমার ভেতরে অনেক মমতা আছে। কিন্তু বাবা হওয়ার পর আবিষ্কার করলাম, তাতিয়ানার জন্য যেটুকু মমতা তৈরি হয়েছে সেটা পৃথিবীর সকলের জন্য হয়নি। হলে ভালো হতো... নিজেকে মহাপুরুষ ভাবতে পারতাম। কিন্তু আমি তো মহাপুরুষ নই, খুব সাধারণ একজন মানুষ মাত্র। তবে নিজের মেয়ের জন্য মহাপুরুষ পর্যায়ের মমতা জমে আছে টের পাই। বইটা লেখার সময় এই মমতাটুকুর পুরোটা দিয়ে লিখতে চাই। তাই বইয়ের নাম 'প্রিয় তাতিয়ানা'-ই থাকলো। এছাড়া, তাতিয়ানা নামটার একটা আরবান মিনিং হচ্ছে গ্রান্ড প্রিন্সেস। আমাদের সকলের বাচ্চারা তো আমাদের কাছে এক-একজন প্রিন্স/প্রিন্সেস। আপনার আমার সকলের বাচ্চাই তো আসলে তাতিয়ানা।

ত্রিভুজ আলম
৫ আগস্ট, ২০১৬
উত্তরা, ঢাকা


Thoughts