বাচ্চা লালন-পালনঃ তাতিয়ানা ও আমি

একটা বাচ্চাকে কিভাবে বড় করা উচিত তা ভালোভাবে জানতে গত তিন-চার বছর ধরে বাচ্চা লালন-পালন বিষয়ক অনেক আর্টিকেল পড়েছি। বেশ কয়েকটা বই পড়েছি। আর তারচাইতেও বেশী করেছি চিন্তা এবং পর্যবেক্ষন। পর্যবেক্ষন সম্ভব হয়েছে কারণ- তাতিয়ানা হওয়ার পরপরই আমি গুলশানের অফিস ক্লোজ করে উত্তরা নিজের বাসায় অফিস খুলে বসি। বাকীরা কাজ করতো রিমোট অফিসে। ফারাহ সকালে অফিস চলে যেত। দুপুরে এসে তাতিয়ানাকে খাইয়ে আবার চলে যেত এবং সন্ধ্যার পর ফিরে রাতের খাবার দিতো। এর মাঝখানের দেখাশোনাটুকু আমি করতাম। আমার ধারণা ছিলো তাতিয়ানাকে দেখার পাশাপাশি কাজ করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা পুরোই ভিন্নরকম ছিলো। একটা বাচ্চাকে যে কি পরিমান সময় দিতে হয় সেটার খুব বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো গত তিন বছরে। ফারাহ বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া থেকে ফেরা পর্যন্ত একদম পুরোটা সময় আমার তাতিয়ানাকে দিতে হয়েছে। কাজ করতে বসতাম শুধুমাত্র তাতিয়ানা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর।

আমি জানি না বাচ্চা লালন-পালন সম্পর্কে কতটুকু শিখতে পেরেছি। কিন্তু তাতিয়ানাকে নিয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট। সে অনেক চঞ্চল কিন্তু কখনো কোন জিনিষ নষ্ট করে না। প্রচুর উৎসাহী কিন্তু যন্ত্রনা দেয় না। নো-কান্নাকাটি। নো মারামারি। কেউ তার খেলনা হাত থেকে কেড়ে নিলে সে আরেকটা খেলনা খুঁজে নেয় খেলার জন্য। কোনরকম যন্ত্রনা করে না। আমি জানি না, জেনেটিক্যালিই সে এরকম হয়েছে কিনা... কিন্তু এটুকু বলতে পারি যে- ওকে অনেক যত্ন করে অনেক সাবধানতার সাথে বড় করছি।

বাংলাদেশে বাচ্চা লালন-পালন সংক্রান্ত অনেক ভুল আচরণ আছে। এসব ভুলের কিছু কিছু নিয়ে আজকে আলোচনা করবো, সাথে এসব ক্ষেত্রে তাতিয়ানার সাথে আমি কি করেছি সংক্ষেপে সেটা বলবো।

১) বাচ্চাদের ব্যক্তিত্ব

একটা মানুষের মানসিক গঠনটা তৈরি হয় তার পরিবার থেকে। জীবনের প্রথম কয়েক বছর অনেক গুরুত্বপূর্ন। এসময় একটা বাচ্চা অনেক কিছু শেখে যেটা তার পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলে। একটা বাচ্চার শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ বলে মনে হয়। নয়তো বাচ্চাদের সামনে তারা এমন অনেক কাজ করেন যেগুলো করার কথা না। অনেককেই বলতে শুনবেন- 'বাচ্চা মানুষ, সে কি আর বোঝে!' অথচ, বাচ্চারা বড়দের চাইতে বেশী বোঝে। বেশী রপ্ত করে সবকিছু। আপনি বাচ্চাদের সাথে এবং তাদের সামনে যা যা করবেন সবকিছু থেকেই সে শিখবে। এবং সেভাবেই তার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে। একটা ফ্যামিলি সম্পর্কে ধারণা নিতে চান? তাহলে সেই ফ্যামিলির একটা বাচ্চার আচরণ খেয়াল করুন।

২) চিল্লানোসোরাস বাচ্চা

অনেক বাচ্চা দেখবেন চিৎকার করে এলাকা কাঁপিয়ে দেয়। আমার যেটা মনে হয়েছে- একটা নতুন বাচ্চা প্রথম কিছুদিন এমনিতেই চিৎকার করবে। তারপর সে কোন একটা সমস্যার জন্য চিৎকার করে। এই যেমন- আপনি যা খাওয়াচ্ছেন সেটা হয়তো তার ঠিকমত হজম হচ্ছে না বা শোয়ানোর ভঙ্গি/শারিরিক কোন সমস্যা। অধিকাংশ মানুষই বাচ্চাদের এই সমস্যাগুলো চিহৃিত করার চেষ্টা না করে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বা আদর করে কান্না থামানোর চেষ্টা করে। এটা একসময় বাচ্চাটার অভ্যাসে পরিনত হয়। তার যখনই আদর বা মনোযোগ দরকার হয় সে তখনি কান্না জুড়ে দেয়। তাতিয়ানা প্রথম প্রথম যখন এরকম কান্না করতো তখন আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি কেন সে কাঁদে। দেখা গেল কোলে নিয়ে এক্সট্রা আদর বা অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়েই কান্না থামানো যাচ্ছে। তারপরেও মাঝে মাঝে কাঁদতো যেটার কোন কারণ ছিলো না। এরকম ক্ষেত্রে আমি তার দিকে অতিরিক্ত কোন মনোযোগ দিতাম না। অনেক খারাপ লাগতো কিন্তু আমি জানতাম এটা তার ভালোর জন্যই। কয়েকদিনের ভেতরে তাতিয়ানা খেয়াল করলো যে- চিৎকার করে কোন লাভ হচ্ছে না তারচাইতে একটা হাসি বা হাত বাড়িয়ে দিলে বেশী কাজ হচ্ছে। এভাবে সে ধীরে ধীরে কান্নাকাটি করা ভুলে গেল। আজকাল তো একদম কাঁদেই না। তাতিয়ানার কান্না শুনেছে এরকম মানুষের সংখ্যা খুবই কম।

৩) বাচ্চাদের শাসন করা

তাতিয়ানাকে কখনো বকা দেই না। তবে মাঝে মাঝে যখন ভুল কিছু করে ফেলে তখন খুব নরম কণ্ঠে 'ছি বাবা' বলি। তাতে কাজ না হলে তার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। ব্যাস.... সে যা বোঝার বুঝে যায়। তাতিয়ানার আর কিছুদিন পর তিন বছর হয়ে যাবে। আজকাল 'ছি বাবা'-ও বলতে হয় না। চোখের দৃষ্টি দেখেই বুঝে যায় সব এবং দৌড়ে এসে অপরাধীর ভঙ্গি করে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকায় অথবা শুয়ে পড়ে। তখন কোলে নিয়ে বুঝিয়ে দেই যে- ইটস অলরাইট। কোথায় যেন পড়েছিলাম- একটা বাচ্চাকে প্রথম পাঁচবছর কোন বকা দিতে হয় না। বলেছিলেন খুব বিখ্যাত একজন লোক, নামটা এই মূহুর্তে মনে আসছে না। আমি ঠিক করেছি তাতিয়ানাকে কোনদিনই বকা দেব না। ওর সাথে আমার টিউনিংটা এত ভালো হয়ে উঠেছে যে- সে কি ভাবছে আমি বুঝতে পারি আবার আমি কি ভাবছি সেটাও সে বুঝতে পারে। এমনকি চোখের দিকে না তাকিয়েও। এই টিউনিং যদি আপনার বাচ্চার সাথে করে নিতে পারেন তাহলে বাচ্চাকে কোনদিন বকা দিতে হবে না।
আর যারা মনে করেন বাচ্চাদের খুব কড়া শাসনে রাখা দরকার, তারা খুব ভুল করছেন। আমি তো শিশু বিশেষজ্ঞ নই, তাই সরাসরি কোন উপদেশ না দেয়াই সমীচিন মনে করছি। তবে অনুরোধ থাকবে বাচ্চাদের সাইকোলজি নিয়ে একটু পড়াশোনা করার।

৪) ধ্বংসাত্বক আচরণ

একবার এক আত্মীয় আসলেন বাসায়। সাথে ছোট একটা বাচ্চা। ঘন্টাখানেকের ভেতরে সেই বাচ্চা বাসার সব ওলট পালট করে দিয়ে গেল। কাঁচের কি কি যেন ভেঙ্গেও দিয়েছিলো। এরকম বিধ্বংসী বাচ্চা আমি জীবনে মাত্র তিনটি দেখেছি এবং আর দেখতে চাই না। এই তিন বিধ্বংসী বাচ্চার ভেতরে এক বাচ্চার প্যারেন্টসদের খুব ভালো করে পর্যবেক্ষন করেছিলাম। যা বুঝলাম... তাদের উৎসাহেই বাচ্চার এই অবস্থা। উৎসাহের ব্যপারটা কিরকম বলি। একবার তাদের বাচ্চা একটা দরকারী জিনিষ ভেঙ্গে ফেললো। তারা সেটা নিয়ে বাচ্চার সামনেই গল্প করতে লাগলো যে- কত ক্রিয়েটিভ ওয়েতে বাচ্চাটা জিনিষটা ভেঙেছে। বাচ্চাদের সব আচরণই আমাদের কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে এবং আমরা গল্প করতে চাই। তাই এটা একটা স্বাভাবিক প্রবনতা। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আলোচনা যখন বাচ্চাটার সামনে খুব উৎসাহ নিয়ে করা হয় তখন সে ভাবে তাকে এপ্রিশিয়েট করা হচ্ছে। এতে সে আরো বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। একটা সময় পরে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তাতিয়ানা যে কখনো কিছু ভাঙেনি এমন নয়। একবার কিযেন একটা ভেঙ্গে ফেললো। আমি তাকে শুধু হালকা করে বললাম- 'ছি বাবা, কাজটা ভালো হয়নি'। এইটুকুই। এই ভাঙ্গার গল্প আর কাউকে বলিনি। ওর সামনে তো নয়ই।

৫) বাচ্চাদের হ্যাঁ বলুন

বাচ্চাদের কখনো কোন ব্যপারে 'না' বলা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। কেন, সেটা আপাতত ব্যাখ্যা করছি না। ইন্টারনেট ঘাঁটলে বা বাচ্চাদের সম্পর্কে কিছু বই পড়লেই বুঝতে পারবেন। শুধু এইটুকু মাথায় রাখেন, এই 'না' অথবা নেতিবাচক যেকোন শব্দ ও আচরণ বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আসলে শুধু বাচ্চাদের ব্যপারেই নয়, নিজের জীবনে এই 'না' শব্দটা যত কম ব্যবহার করবেন তত ভালো। এর অল্টারনেটিভ খুঁজে বের করুন। নেতিবাচক সকল শব্দ ও আচরণ থেকে যত দূরে থাকতে পারবেন তত ভালো।

৬) বেয়ারা বাচ্চা

বাচ্চা যদি আপনার কথা না শোনে, এর প্রায় শতভাগ দায়ই আপনার নিজের। মানে অভিভাবকের। এই বিষয়ে আরেকদিন বিস্তারিত আলোচনা করবো। আপাতত চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করুন।

সবার শেষে আরেকটা পরামর্শ দেই। বাচ্চা লালন-পালন করার জন্য অনেক পড়া উচিত সত্যি, কিন্তু বাই বুক বাচ্চা লালন-পালন করার চেষ্টা না করাই ভালো। বাচ্চাকে তার নিজের মত বাড়তে দিন। আপনি অবজার্ভার হিসেবে থাকুন, মোস্ট অব দ্য টাইম।

ভালো থাকুন।


Thoughts