বাক স্বাধীনতা, ফেসবুক ও আমার একটি স্বপ্ন

বাক স্বাধীনতা বলতে যা বোঝানো হয় সেরকম কোনকিছু কি পৃথিবীতে আছে? না মনে হয়। অন্তত আমি দেখতে পাচ্ছি না। থাকা উচিত কিনা সেই আলাপে আজকে যাবো না, তার চাইতে বিভিন্ন স্থানে বাক স্বাধীনতার অবস্থা নিয়ে আলাপ করা যাক।

বিবিসির এক সাংবাদিককে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম- ইউরোপে এন্টি সেমেটিক কোন বক্তব্য কি আমি দিতে পারবো? তিনি বললেন- 'না'। 'তাহলে বাক স্বাধীনতা ব্যপারটা আসলে কী?', জানতে চেয়েছিলাম। আমেরিকান আর্মির এক সাবেক অফিসার আমার বন্ধু তালিকায় আছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- 'বাক স্বাধীনতা বলতে যা বলা হচ্ছে, আমেরিকায় কি সেটা আছে?' সে বললো- অনেস্ট অপিনিওন হচ্ছে- 'নাই'। তারপরেও ধরো আমরা তো অনেকের চাইতে বেশী স্বাধীনতা দিচ্ছি।

হ্যাঁ, এই অনেকের চাইতে বেশী স্বাধীনতা দেয়ার ব্যপারটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু বিশ্ব মিডিয়াতে বাক স্বাধীনতার যে সংজ্ঞা প্রদান করা হয়, সেরকম বাক স্বাধীনতা পৃথিবীর কোন দেশেই নেই। এমনকি যেসব মিডিয়া এসব বলে বেড়ায়, তাদের পত্রিকাতেই নেই।

সম্প্রতি ফেসবুকের বাক স্বাধীনতা নিয়ে বেশ জোরেশোরে প্রশ্ন উঠেছে। গার্ডিয়ান সহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এই বিষয়ে রিপোর্ট হয়েছে। ফেসবুকের ব্যপারে এধরনের প্রশ্ন অনেক আগে থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে ছিলো। ইসরাইল বিরোধী অনেক কনটেন্ট ফেসবুক সরিয়ে ফেলতে দেখেছি। কিন্তু সম্প্রতি কাস্মীর ইস্যুতে ফেসবুকের যে ভূমিকাটা নিচ্ছে, এটা একেবারে নতুন। জাকারবার্গের বক্তব্যগুলোর সাথে এগুলো পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কাস্মির ইস্যুতে লেখালেখির জন্য বহু লোকের ফেসবুক একাউন্ট ডিলিট করে দেয়া হয়েছে (ব্যান নয়, একেবারে ডিলিট)। বহু কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফেসবুকের বায়াসনেস এর আগে এত প্রকটভাবে আর কখনো এভাবে ধরা পড়েনি। এটা খুব বেশী দৃষ্টিকটু এই কারণে যে- বাক স্বাধীনতার ব্যপারটা ফেসবুকের চাইতে বেশী কোন প্লাটফর্ম আজ পর্যন্ত দিতে সক্ষম হয়নি। একারণে ব্যপারটা অনেকে মেনে নিতে পারছেন না।

ফেসবুকের এই নির্লজ্জ বায়াসনেসের প্রতিবাদে বাংলাদেশী একটিভিস্টদের ভেতরে অনেকে দেখলাম ফেসবুক ত্যাগের কথা ভাবছেন। এই বিষয়ে আমার নিজের কিছু চিন্তা শেয়ার করি। প্রথমত, ফেসবুক একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা দেশগুলোতে পুঁজিবাদ saturated হয়ে যাওয়াতে পুঁজিবাদীরা দক্ষিন এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়েছে। এখানে পুঁজিবাদ এখনো অতটা গেঁড়ে বসেনি। ব্যবসার স্বার্থে এখানকার বড় শক্তিগুলোর অনেক অন্যায় আবদারও পুঁজিবাদীরা মেনে নিবে। সেটা আপনার পছন্দ হোক বা না হোক। সেটা তাদের নীতিমালার সাথে যাক বা না যাক। দক্ষিন এশিয়াতে ভারত ও চীন বড় শক্তি। চীন তো ফেসবুক ব্যান করেই বসে আছে। ভারতও যদি ব্যান করার হুমকি দিয়ে ফেসবুকের কাছে নানারকম আবদার জুড়ে দিয়ে বসে থাকে, তাহলে ব্যবসার স্বার্থে ফেসবুক সেগুলো মেনে নিতে পারে বা নিবে বলেই মনে হচ্ছে। সবার উপরে ব্যবসা সত্য। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে অন্যের প্লাটফর্মে কখনো আপনি সবকিছু নিজের মত পাবেন না। পাওয়ার কথাও নয়। ফেসবুক জাকারবার্গের প্লাটফর্ম। জাকারবার্গ যা বলবেন সেটাই এখানে আইন। পৃথিবীর প্রতিটা সাইটে, প্রতিটা প্লাটফর্মে এরকম ব্যপার আছে। ফেসবুক গ্রুপগুলোই দেখুন, এডমিনরা যা বলেন সেটাই ওখানকার আইন। এখন এই আইন মেনে যেটুকু চলা সম্ভব চলতে পারেন। পুরোপুরি নিজের মত স্বাধীনতা শুধু আপনি আপনার নিজের তৈরি প্লাটফর্মেই পাবেন।
সুতরাং, ফেসবুকের নীতিমালা মেনে যেটুকু স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব হয় সেটুকু নিতে পারেন। পাশাপাশি পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করার জন্য নিজের প্লাটফর্ম গড়ে নিন। সেটা হতে পারে একটা ব্যক্তিগত সাইট/ব্লগ/ফোরাম বা পার্সোনালাইজড এপ্লিকেশন।

কথা হচ্ছে আমজনতা এরকম পার্সোনালাইজড প্লাটফর্ম বানাবে কিভাবে? আনন্দের সংবাদ হচ্ছে গত চার বছর ধরে এরকম একটি প্লাটফর্ম নিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। এটা একই সাথে বিজনেস প্লাটফর্ম ও ব্যক্তিগত প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এর ভেতরে ব্যক্তিগত অংশটুকু হবে ফ্রি, ওপেন সোর্স। যে স্বপ্ন নিয়ে এই প্রজেক্ট শুরু করেছি, সেটা সফল হলে ভবিষ্যতের সোশ্যাল মিডিয়া হবে পুরোপুরি পার্সোনালাইজড ও অন্যকারো চোখ রাঙানি মুক্ত।


Thoughts