সুখী মানুষের খোঁজে

জগতে কিছু মানুষ আছে যারা স্ফটিক স্বচ্ছ জলাধারের মত। শান্ত, সৌম্য আর হাসি-খুশী। তাদের নিজেদের ভেতরে যেমন সুখী সুখী একটা বিরাজ করে, তাদের সাথে থাকলে অন্যরাও একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করে। এধরনের মানুষের কাছাকাছি থাকলে কেন শান্তি শান্তি লাগে তার ব্যাখ্যা নিউরোসায়েন্টিস্টরা ভালো দিতে পারবে হয়তো, কিন্তু আপনি নিজে কিভাবে এধরনের মানুষগুলোর একজন হতে পারেন? কিভাবে? ভাবা যেতে পারে।

মানুষের মনকে যদি এরকম জলাধারের সাথে তুলনা করেন, তাহলে ভেবে দেখুন- আপনার সেই জলাধার কতটা স্ফটিক স্বচ্ছ আর শান্ত। অথবা, চিন্তা করে বের করুন- এই দু'টো অবস্থায় আপনার মন পৌঁছানোর পথে বাঁধাটা কোথায়? এই ভাবনাটাও সচল রাখুন, কিছু বের হয়ে আসলেও আসতে পারে।

বেশ কিছুদিন আগে স্কুলের বন্ধুদের একটা ইফতার পার্টির ইভেন্টে গোয়িং দিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে দেখা হয়না এরকম বেশ কয়েকজন বন্ধুর দেখা পেলাম। তাদের প্রোফাইল ঘেঁটে আরো কয়েকজনকে পাওয়া গেল। বহুদিন পর পুরানো বন্ধুদের দেখে যে আনন্দটা হলো, এর সাথে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। এরকম পুরানো এক বন্ধুর সাথে কথায় কথায় জীবনের চাওয়া পাওয়া, হ্যাপিনেস প্রসঙ্গে আলোচনা হলো। আমার দৃষ্টিতে তার জীবনে সুখী হওয়ার যথেষ্ঠ উপাদান বিদ্যমান, কিন্তু সে নিজে সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। তার জীবনে প্রেরণার বড়ই অভাব। জানতে চাইলাম, কারণ কী? বলতে পারলো না। মনে করে দেখলাম, এই প্রসঙ্গে আজ পর্যন্ত যতজনের সাথে কথা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগের অবস্থাই এরকম ছিলো। তাদের সবচাইতে বড় সমস্যা ছিলো- তারা জানতো না, কী চায়। তবে এদের প্রায় সবার কিছু কমন ধ্যান ধারণা আছে। অমনটা হলে বুঝি খুব ভালো থাকতাম। অনেক টাকা পয়সা থাকলে, খুব ভালো হতো! ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার বেশ কিছু কোটিপতি বন্ধু আছেন যারা বয়সে আমার চাইতে অনেক বড়। তাদের ভেতর থেকে কয়েকজনকে প্রশ্ন করেছিলাম- 'আঙ্কেল, এত টাকা দিয়ে কি করবেন? বা আসলেই আনন্দটা কোথায়?' একজনের উত্তর ছিলো অনেকটা এরকম- 'দ্যাখো, আমার কত টাকা আছে আমি নিজেও জানি না। এক সময় যখন টাকা কম ছিলো তখন প্রতিদিন হিসেব করতাম, এখন করি না। এখন আমার জীবনের মূল আনন্দটা মাসের প্রথম সপ্তাহে। যখন আমার ফ্যাক্টরিগুলোতে কাজ করা লোকদেরকে স্যালারি দেয়া হয়। আমি সার্ভিলেন্স ক্যামেরায় বসে বসে তাদের সেই সুখী সুখী মুখগুলো দেখি। এটাই প্রেরণার উৎস।' বাকীদের উত্তরও মোটামুটি কাছাকাছি ছিলো। এঁরা কেউই নিজের জন্য কিছু করে না। এদের প্রত্যেকেরই কেউ না কেউ আছে, কিছু না কিছু আছে। যাদের জন্য তারা করেন। এক যুগ ধরে পৃথিবীর শীর্ষ ধনী বিল গেটসকে দেখেন, তিনি জীবনে অর্জিত সমস্ত সম্পদ (প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার) মানুষের সেবায় দান করে দিচ্ছেন। দ্বিতীয় ধনী ওয়ারেন বাফেটও অনেক বড় ধরনের দানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে। মার্ক জাকারবার্গ তাঁর সম্পদের বেশীরভাগটাই চ্যারিটিতে দিয়ে দিবেন ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু যার/যাদের কেউ নেই? বা থেকেও না থাকার মত? এরকম প্রচন্ড ক্ষমতাশালী আংকেলের কথা বলি। তাঁর কত টাকা আছে সেটা তিনি নিজেও জানেন না। সপ্তাহের ছয় দিন এত বেশি ব্যস্ত থাকেন, বলার মত না (আমি দেখতাম আর অবাক হতাম, একজন মানুষের পক্ষে এত কাজ করা কিভাবে সম্ভব?! বাকী একদিন... পুরোটাই কাটে ক্লাবে অথবা ব্যক্তিগত বারে বসে ড্রিংক করে। ঐ আংকেলের বাসায় এক রাতে ছিলাম। এক প্যাকেট ব্যানসন নিয়ে বারান্দায় লাইট বন্ধ করে তিনি বসেছিলেন। অনেক কথা বললেন, যা নিয়ে আগে কখনো কোন ধারণা ছিলো না। মানুষ কি চায়, কি পায়। মানুষের জীবন, কত অদ্ভুত! বেশির ভাগ মানুষ যেখানে হ্যাপিনেস দেখতে পায়, সেখানে যে তা নেই সেদিন সবচাইতে ভালো বুঝতে পেরেছিলাম।

বিখ্যাত অভিনেতা জীম ক্যারির একটা চমৎকার উক্তি দিয়ে এই পর্বটা শেষ করি-
"I think everybody should get rich and famous and do everything they ever dreamed of so they can see that it's not the answer" Jim Carrey

ছবিঃ ২০১৩ সালের কোন এক মধ্য দুপুরে সেন্ট মার্টিন প্রবাল দ্বীপে তুলেছিলাম।


Thoughts