ভালো চাওয়ার রোগ

মানুষের ভালো চাওয়া ভালো। কিন্তু এই সকল ভালো চাওয়া কি আসলেই ভালো চাওয়া? অনেকেই আছে, যাদের এই ভালো চাওয়াটা মানসিক রোগে পরিনত হয়। সেই রোগের কিছু নমুনা তুলে ধরি।


|| ১ ||

'ইস! এইসব বই আমি পড়ে আমি কত জ্ঞানী হয়ে গেছি, অন্যরা কেন পড়ে না? তারা কেন অমুক লেখকের বইই শুধু পড়ে? খাইছি তাগোরে...' ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়া। অনেকের প্রিয় কোন লেখকের নামে যা তা বলে সেই লেখকের ফ্যানদের মনে আঘাত দেয়া। অতি সরলীকরণ করে মানুষকে অপমান করার চেষ্টা করা।
এই যে আঘাত দেয়া বা অপমানের চেষ্টা করা, এগুলো কেন করে মানুষ? আরেকজনের ভালো চেয়েই তো? এই ভালো চাওয়ার কোন পজেটিভ ফল আছে?

|| ২ ||

ভালো চাওয়া রোগে সবচাইতে বেশী আক্রান্ত পাশের বাসার ভাবী আর আন্টিরা। তাদের ভালো চাওয়ার কোন সীমা-পরিসীমা নাই। ভালো চাইতে গিয়ে তারা অনধিকার চর্চা করতে করতে কত মানুষের জীবন যে দুর্বিষহ করে ফেলেছে যদি জানতো! আমাদের প্রজন্মের মোটামুটি সবাই এই বিষয়ে অভিজ্ঞ তাই বিস্তারিত বললাম না। তবে নতুন প্রজন্মের যারা ঢাকায় ফ্ল্যাটগুলোতে বড় হয়েছে, তারা অনেকটা ভাগ্যবান বলতে হয়। ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে পাশের ফ্ল্যাটের লোককেও মানুষ চেনে না। এটা ভালো না খারাপ সেই আলাপে আজকে যাবো না তবে এটা যে 'ভালো চাওয়া' রোগে আক্রান্ত লোকগুলো থেকে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে রক্ষা করছে, সেই বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত থাকুন।

|| ৩ ||

ভালো চাওয়ার রোগের অন্যতম ভয়ংকর উদাহরণ হচ্ছে একশ্রেণীর স্বঘোষিত 'ধার্মিক' লোক। তারা নিজেদের ধার্মিক মনে করে ও বলে বেড়ায়, তাই 'ধার্মিক' ট্যাগটা ব্যবহার করলাম। সত্যিকার ধার্মিকরা ভুল বুঝবেন না দয়া করে। যাহোক, কী করে এই ধার্মিকেরা? তাদের দৃষ্টিতে তারা বাদে বাকী সব মানুষ ভুল পথে আছে। তাদের যেকোন মতামতের সাথে সাথে চুল পরিমান দ্বিমত করলেই হয়েছে, আপনাকে গোল্লার গ্রীনকার্ড ধরিয়ে দিবে। তারপর আপনার জীবনে হয়তো দুঃখজন কিছু ঘটেছে, এরা সেটা অন্যদের দেখিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলো বলবে- 'দেখছেন? কইছিলাম না... এমনই হইবো!' এছাড়াও এরা আপনার 'ভালো চেয়ে' আপনার দিকে তেড়ে আসবে। আপনাকে চাপাতি দিয়ে কোপাতেও পারে। অথবা অন্যকে কোপাতে দেখলে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করে। এই সবই তারা করে মানুষের 'ভালো' চেয়ে।

আহ! কি অদ্ভুত ভালো চাওয়া তাদের। এদের রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

|| ৪ ||

এই ভালো চাওয়ার ক্যটাগরিতে আছে একশ্রেণীর আত্মীয়-স্বজন। তাদের প্রথম ও সবচাইতে প্রিয় টার্গেট হচ্ছে ছোটরা। বিশেষ করে স্কুল পড়ুয়া ছেলে/মেয়েরা। আহ! কি ভালোটাই না তারা চায়.. সেই ভালো চাওয়ার জের টানতে হয় ছোটছোট কোমলমতি বাচ্চাদের। ভিকটিম মাত্রই জানেন, এই 'ভালো চাওয়া' রোগটা কতটা খারাপ। আপনার যদি অভিজ্ঞতা থেকে থাকে তাহলে মনে করে দেখেন তো, এরা কি আসলেই আপনার ভালো চেয়েছিলো? নাকি নিজের স্যাডিস্ট মানসিকতা বহিঃ প্রকাশ করেছিলো মাত্র? প্রত্যেকটা বাচ্চার বাবা-মা'র উচিত এধরনের স্যাডিস্ট পাবলিকগুলো থেকে তাদের বাচ্চাদের আগলে রাখা। বাচ্চাদের পৃথিবী হোক এধরনের 'ভালো চাওয়া' স্যাডিস্টদের ভয় মুক্ত।

|| ৫ ||

সবচাইতে নিকৃষ্ট ধরনের 'ভালো চাওয়া' রোগ হচ্ছে পারিবারিক উপদেশ দেয়া। একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা অন্যদের পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকেন। এইসব সমাধানের বেশীরভাগটা জুড়েই থাকে নেগেটিভ কোন পরামর্শ যা ধীরে ধীরে একটি সম্পর্কে ভাঙন ধরাতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এরা আপনার 'ভালো চেয়ে' এমন সব বুদ্ধি-পরামর্শ দিবে যেগুলো গ্রহণ করলে আপনার সমস্যাগুলো আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। আমি লক্ষ্য করে দেখিছি, মূলত অসূখী ধরনের মানুষেরা অন্যদের এধরনের নেগেটিভ পরামর্শ দিয়ে থাকে। এটা পরিষ্কার ভাবেই এক ধরনের মানসিক রোগ। এদের থেকে সাবধান থাকুন, ভালো থাকুন।।

আর নিজের পারিবারিক সমস্যা নিজের বুদ্ধিতেই সমাধানের চেষ্টা করুন। হালকা হওয়ার জন্য খুব কাছের কারো সাথে শেয়ার করতে পারেন (যত কম করবেন ততই ভালো) কিন্তু তাদের পরামর্শ যত কম নিবেন ততই ভালো। কারণ, বাইরে থেকে একজন মানুষের পক্ষে কখনোই আপনার পারিবারিক সমস্যা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

|| ৬ ||

রাজনৈতিক ভাবে বিভক্ত জনগোষ্ঠীরাও এই গ্রুপের সদস্য। বিশেষ করে আমজনতা যারা রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনরকম সুবিধা না পেয়েও নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দলেরর জন্য প্রতিপক্ষের মাথা ফাটাতে প্রস্তুত। তারা মনে করে 'মানুষের ভালোর' জন্য এটা করা প্রয়োজন। তাদের এই বিভক্তির সুযোগে কারা লাভবান হচ্ছে যদি জানতো তাহলে মানুষের ভালোর জন্য হলেও রাজনৈতিক কারণে এত উগ্র হতো না। নানারকম রাজনৈতিক দর্শন থাকবে। সেগুলোর ভালো-খারাপ দিক থাকবে। বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সেগুলো পর্যালোচনা করে অধিক ভালো বা মন্দের ভালোটা বেছে নিতে পারেন। কিন্তু সেটা নিয়ে খুব এক্সাইটেড হওয়ার কিছু নেই। কারণ, রাজনৈতিক সীমানা ও রাজনৈতিক ভাবে মানুষকে বিভক্ত করার ব্যপারটা খুব প্ল্যান করেই করা হয়েছে। গুটি কয়েক মানুষ পৃথিবীকে নিজেদের হাতের মুঠোয় পুরো রাখার সুবিধার্থে এসব করে রেখেছে।

|| ৭ ||

কোন ব্যক্তির ভুল ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টাও এই রোগের একটা উপসর্গ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কারো 'ভালো চেয়ে' করার ভান করে করলেও আসলে আত্মতৃপ্তির জন্য করা হয়। এমনকি আপনার হয়তো মনে হচ্ছে ভালো চেয়েই করছেন কিন্তু অবচেতন মনে আত্মতৃপ্তির পাওয়ার একটা পথ হিসেবে আছে। আর যদি ভালো চেয়ে করেও থাকেন, বেশীরভাগ মানুষই এভাবে নিজেদের সংশোধন করে না। তারা এটাকে আক্রমণ হিসেবে ধরে নিয়ে পাল্টা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এতে ভুলটা সংশোধন হওয়ার পরিবর্তে আরো গেড়ে বসে। সুতরাং এটা করে আপনি তার উপকার করছেন না, আরো ক্ষতি করে দিচ্ছেন।

মানুষ ভুল করবেই। মানুষ হিসেবে একজন ব্যক্তিও ভুল করবে। আপনি যদি তার ভালো চান তাহলে সরাসরি ঐ ব্যক্তির ভুল হিসেবে না দেখিয়ে অন্যভাবে দেখান। আর একটা করার জন্য সঠিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করে নিলে ইফেক্টিভ হয়।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সরাসরি ভুল ধরে আত্মতৃপ্তি পাওয়া ছাড়া আর তেমন কোন লাভ হয় না।


Thoughts